Monday, January 3, 2011

কোল্লাপাথর শহীদ স্মৃতি পর্যটনকেন্দ্র

কুমিল্লার সীমান্তবর্তী উপজেলা ব্রাহ্মণপাড়া। ওই উপজেলার সালদা নদী রেলস্টেশন থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে গেলে চোখে পড়বে টিলাঘেরা একটি সুন্দর সমাধিস্থল। নাম কোল্লাপাথর শহীদ সমাধিস্থল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলায় এর অবস্থান। এখানে ৫০ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধি এটি। সারিবদ্ধভাবে সাজানো মুক্তিযোদ্ধাদের ওই সমাধি দেখতে সারা বছরই পর্যটকদের ভিড় থাকে। সমাধিস্থলের চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার উঁচু-নিচু টিলা, নানা প্রজাতির বৃক্ষ, সামাজিক বনায়ন আর সবুজের সমারোহ পর্যটকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। সমতল ভূমি থেকে বেশ কয়েকটি সিঁড়ি মাড়িয়ে মূল বেদিতে পা রাখার পর হাতের বাঁয়েই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সারিবদ্ধ কবর।
ওই সমাধিস্থলের তত্ত্বাবধায়ক মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুল করিম বলেন, ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এলাকা কসবা। যুদ্ধকালীন এখানে পাকিস্তানি বাহিনী আর এ দেশীয় দোসরদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক লড়াই হয়। ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে এখানে যুদ্ধ সংঘটিত হলে বিপুল লোক হতাহত হয়। প্রাণ হারান অগণিত মুক্তিযোদ্ধা। তখন বিভিন্ন এলাকা থেকে যুদ্ধে নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের কোল্লাপাথর শহীদ সমাধিস্থলে এনে কবর দেওয়া হতো। আমার বাবা আবদুল মান্নান ৬৫ শতক জায়গা তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধির জন্য দান করেছেন। বাবা, এলাকাবাসী আর আমি মিলে কাঁধে করে ওই মুক্তিযোদ্ধাদের এখানে সমাধিস্থ করতাম। ওই সমাধিস্থলই এখন ভ্রমণপিপাসু মুক্তিযুদ্ধপ্রেমী প্রজন্মের কাছে অহংকার হয়ে উঠেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গভাবে কোল্লাপাথর শহীদস্মৃতি পর্যটনকেন্দ্র হয়নি। কিন্তু পর্যটনের অবয়বে কিছু স্থাপনা তৈরি হয়েছে। ৩৯ বছর ধরে আমিই সেটি রক্ষণাবেক্ষণ করছি। সকাল-বিকেল পরিচর্যা করছি। যাঁরা এখানে আসেন তাঁদের ওই সময়ের কাহিনি শোনাতে হয়। গাইডের ভূমিকা নিতে হয়।’
এখানে যাঁরা ঘুমিয়ে আছেন, সেই ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা হলেন: সিপাহী দশন আলী, জাকির হোসেন, আবদুল জব্বার, হাবিলদার তৈয়ব আলী, নায়েক আবদুস সাত্তার, সিপাহী আব্বাস আলী, ফারুক আহম্মদ, ফখরুল আলম, মোজাহীদ নূরু মিয়া, নায়েক মোজাম্মেল হক, নায়েক সুবেদার আবদুস ছালাম, নোয়াব আলী, সিপাহী মোসলেম মৃধা, প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম, আবদুল অদুদ, সিপাহী আজিম উদ্দিন, মতিউর রহমান, মোশারফ হোসেন, নায়েক সুবেদার মইনুল ইসলাম, সিপাহী নূরুল হক, আবদুল কাইয়ুম, সিপাহী হুমায়ুন কবির, ল্যান্স নায়েক আবদুল খালেক, ল্যান্স নায়েক আজিজুর রহমান, তারু মিয়া, নায়েক সুবেদার বেলায়েত হোসেন, রফিকুল ইসলাম, মোর্শেদ মিয়া, আশুতোষ রঞ্জন দে, তাজুল ইসলাম, শওকত, আবদুস ছালাম, জাহাঙ্গীর, আমির হোসেন, পরেশচন্দ্র মল্লিক, জামাল উদ্দিন, আবদুল আওয়াল, আবেদ আহাম্মদ, সিরাজুল ইসলাম, ফরিদ মিয়া, মতিউর রহমান, শাকিল মিয়া, আবদুর রশিদ, আনসার এলাহী বক্স, সিপাহী শহীদুল হক, সিপাহী আনোয়ার হোসেন, আবদুল বারী এবং অজ্ঞাত তিনজন।
ওই সমাধিস্থলে রয়েছে নায়েক সুবেদার মইনুল ইসলামের কবর। তাঁর নামেই ঢাকা সেনানিবাস এলাকার অতি পরিচিত মইনুল সড়ক নামকরণ করা হয়েছে। এ সমাধিতে ৫০ জনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে ৪৭ জনের পরিচয় মিলেছে। অন্য তিনজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর সদ্য প্রয়াত ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর আসনের সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফুল হাই সাচ্চুর নেতৃত্বে তৎকালীন জেলা প্রশাসন কোল্লাপাথর শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত কবর চিহ্নিত করে সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ সালে সেখানে একটি কাঠের তৈরি রেস্টহাউস হয়। গত এক দশকে সেখানে স্মৃতিসৌধ, মসজিদ, রেস্টহাউস, সীমানাপ্রাচীর ও পুকুরঘাট বানানো হয়। প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদ ওই কাজ শেষ করে। সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এ বি এম তাজুল ইসলাম একে পর্যটনকেন্দ্রের আদলে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ওই স্থান পরিদর্শন করেন। তাঁদের সম্মতি আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশের অন্যতম সবুজে ঘেরা শহীদস্মৃতি পর্যটনকেন্দ্র হবে এটি। কোল্লাপাথর থেকে খুব কাছেই ভারতীয় সীমান্ত। দুই দেশের ভ্রাতৃত্ববোধের জন্য এ পর্যটনকেন্দ্র মনে করিয়ে দেবে যুদ্ধকালীন সহযোগিতার কথা।
কোল্লাপাথর শহীদস্মৃতি পর্যটনকেন্দ্র বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মো. আজাদ সরকার লিটন। কয়েক বছর ধরে তিনি এর জন্য আন্দোলন করছেন। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ঢাকায় গণজাগরণ সৃষ্টির জন্য নানা কর্মসূচি পালন করছেন। সরকারি মহলে আবেদন করেছেন। তিনি বললেন, মুক্তিযুদ্ধের সরকার চাইলেই এটি পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হবে। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক কুণ্ডু গোপীদাস, একই বোর্ডের সাবেক সচিব মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক হাবিবুর রহমান ও কুমিল্লা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সফিউল আহমদ বাবুলের মতে, পাঠ্যপুস্তকে কোল্লাপাথরের ইতিহাস তুলে ধরা দরকার। নতুন প্রজন্ম নানাভাবে বিপথগামী হচ্ছে, ওদের ফেরাতে হলে ওই দর্শনীয় স্থানকে আরও ঢেলে সাজাতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগিয়ে তুলতে হবে।
উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা আর এ প্রজন্মের সঙ্গে সেতুবন্ধের জন্য সেখানে পালিত হচ্ছে নানামুখী কর্মসূচি। আগামী বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার দশক। ওই মাহেন্দ্রক্ষণকে সামনে রেখে কোল্লাপাথর পরিপূর্ণভাবে শহীদস্মৃতি পর্যটনকেন্দ্র হবে। বেড়াতে আসা পর্যটকেরা এর দৃষ্টিনন্দন রূপ দেখে মোহিত হবে। এমন আশায় রইলেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। 
 
গাজীউল হক |
Ref: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-12-29/news/119160 

বনসাই শিল্পের গোড়ার কথা

খর্বাকৃতি বৃক্ষের উৎপাদন ও বৃদ্ধির শিল্পই বনসাই শিল্প। বনসাই শিল্পে ব্যবহৃত বৃক্ষগুলো বংশানুক্রমে খর্বাকৃত নয়। শিকড় এবং শাখাগুলো কেটে এবং তার দিয়ে বেঁধে শাখাগুলো একটি নিয়মে আবদ্ধ করার পদ্ধতি দ্বারা গাছগুলো খর্বাকৃতি করা হয়। ১ হাজার বছর আগে চীনে এ শিল্পের উদ্ভব হয়। কিন্তু দ্বাদশ শতাব্দীতে জাপানিরা এ শিল্পপন্থা অনুসরণ করে এবং বনসাই শিল্পে উন্নতি সাধন করে। বস্তুত বনসাই একটি জাপানি ভাষার শব্দ। যার অর্থ হলো 'ট্রের মধ্যে ফলানো'। দ্বাদশ শতাব্দীতে পশ্চিমারা বনসাই শিল্পের প্রশংসা করে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্ব এ শিল্পে পারদর্শী ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বনসাই শিল্প পশ্চিমা বিশ্বে জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং শীঘ্রই পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বনসাই সমিতি গঠিত হয়। বর্তমানে জাপান বিশ্বজুড়ে জাঁকালো বনসাই ব্যবসা পরিচালনা করছে। বস্তুত প্রকৃতি থেকেই বনসাই শিল্পের প্রেরণা আসে। উচ্চ পর্বতমালায় জন্মানো গাছগুলো জন্মলগ্ন থেকেই খর্বাকৃত হয়। নার্সারি থেকে পাত্রে রক্ষিত গাছগুলোকে বাছাই করে এনে সঠিকভাবে কেটে এবং তাদের আকৃতি ও বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শাখাগুলোকে তার দিয়ে বেঁধে বনসাইয়ে রূপ দেওয়া যেতে পারে। প্রতি এক বছর থেকে পাঁচ বছর পরপর বনসাইকে অন্য পাত্রে নতুনভাবে রোপণ করতে হয়। এটি গাছের বিশেষ শ্রেণী এবং শিকড়ের বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে। পরবর্তী বছরগুলোতে পুনরায় রোপণের সময় ক্রমশ এবং ধারাবাহিকভাবে শিকড়গুলো ছাঁটাই করার ফলে মাটির গোলাটির আকৃতি ছোট হয়। শেষ পর্যন্ত বৃক্ষটি প্রয়োজনমতো ছোট এবং অগভীর পাত্রে রক্ষিত হতে পারে। অন্যান্য গাছের মতো এ গাছেও বারবার পানি ঢালতে হয়। এ গাছে তরল সার ব্যবহার করা হয় এবং গাছের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ডাল কাটা ও শিকড় ছাঁটাই কাজও চালিয়ে যেতে হয়। যে পাত্রে বনসাই লাগানো হয়, বৃদ্ধির জন্য সে পাত্রটি বনসাইয়ের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। বনসাইয়ের পাত্রগুলো সাধারণত মাটির পাত্র হয়। সেগুলো গোলাকৃতি, ডিম্বাকৃতি, সমচতুর্ভুজ, সমকোণী চতুর্ভুজ, অষ্টকোণী বা অসম আকৃতির হতে পারে। তলার দিকে একাধিক পানি নিষ্কাষণের ব্যবস্থা থাকে। অতি ক্ষুদ্রাকৃতি বনসাই দুই ইঞ্চি পর্যন্ত উঁচু হয় এবং বড় হতে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগে। ছোট বনসাই দুই ইঞ্চি পর্যন্ত উঁচু হয় এবং বাড়তে পাঁচ থেকে দশ বছর সময় লাগে। মাঝারি আকারের বনসাই ৬ থেকে বার ইঞ্চি পর্যন্ত উঁচু হয় এবং তিন বছরের মধ্যে জন্মানো যেতে পারে। এক শতাব্দী বা তার চেয়ে বেশি দিনও বনসাই জীবিত থাকতে পারে এবং পরিবারের একটি বিশেষ সম্পদ হিসেবে পুরুষানুক্রমে হস্তান্তরিত হতে পারে। জাপানে এটি একটি জাঁকালো ব্যবসা। বর্তমানে বনসাই ব্যবসায় জাপান সবচেয়ে লাভবান দেশ। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতেও মাঝারি আকারের বনসাই ব্যবসা বেশ জনপ্রিয়। 
প্রীতম সাহা সুদীপ 
Ref: http://www.bangladesh-pratidin.com/index.php?view=details&type=gold&data=Car&pub_no=247&cat_id=3&menu_id=16&news_type_id=1&index=5

লালমাই পাহাড় চূড়ার চণ্ডীমুড়া



কুমিল্লায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের যে কয়েকটি তীর্থস্থান রয়েছে তার মধ্যে চণ্ডীমুড়া ঐতিহ্য অন্যতম। কুমিল্লার আঞ্চলিক ভাষায় অপেক্ষাকৃত ছোট পাহাড়কে মুড়া বলা হয়। পাহাড়ের গায়ে সিমেন্টের সিঁড়ি বেয়ে শীর্ষে উঠে মন্দির দেখার আনন্দই আলাদা। কুমিল্লা শহরের প্রায় ১৩ কিলোমিটার পশ্চিমে কুমিল্লা-চাঁদপুর-বরুড়া সড়কের সংযোগস্থলে দেড়'শ ফুট পাহাড়ের উপরে অবস্থিত চন্ডীমুড়া মন্দির। এটি কুমিল্লার অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান। চণ্ডীমুড়ায় ২টি মন্দির পাশাপাশি অবস্থিত। দক্ষিণ পাশের মন্দিরটি চণ্ডী মন্দির ও উত্তর পাশের মন্দিরটির শিব মন্দির। মন্দির দুটো সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত। সপ্তম শতাব্দীর খড়গ বংশীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাজা দেবখড়গের রানী প্রভাবতী একটি হিন্দু মন্দির প্রতিষ্ঠা করে দেবী সর্বাণীর মূর্তি স্থাপন করেছিলেন। রানী প্রভাবতী হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলেন। চণ্ডীমুড়ার উচ্চতা প্রায় ১৫০ ফুটের উপরে। এর চূড়ায় অবস্থিত এই মন্দির। নিচ থেকে এতে উঠতে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৮০টি সিঁড়ি আছে। সমুদ্র বেষ্টিত পলল গঠিত চত্বর সমভূমি রূপে উদ্ভাসিত মহাতীর্থ চণ্ডীমুড়া, সপ্তম শতাব্দীতে বৌদ্ধরাজ দেবখড়গের স্ত্রী প্রভাবতী দেবী অমরকীর্তি স্থাপনে বদ্ধপরিকর হয়ে ২টি মন্দির স্থাপন করেন। একটি চণ্ডী মন্দির, অপরটি শিব মন্দির। চণ্ডী মন্দিরে অষ্টভুজা সর্বাণী মহা সরস্বতী, অপরটিতে শিবমূর্তি স্থাপন করেন। অদূরে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এক বিশাল দিঘি খনন করেন। বরুড়া থানার অন্তর্গত গোষণা গ্রামের স্বামী আত্ননন্দ গিরি মহারাজ স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে পরিত্যক্ত মন্দিরগুলো পুনঃসংস্কার করেন। বর্তমানে সনাতন ধর্মালম্বী ছাড়াও নানা ধর্মের পর্যটক প্রতিদিনই এই মন্দির পরিদর্শনে আসেন। সরেজমিন দেখা যায়, চণ্ডী মন্দিরের পেছনের দেয়ালে লম্বালম্বিভাবে বেশ বড় ফাটল ধরেছে। মন্দির দুইটিতে নতুন রং করা হলেও ফাটল মেরামতের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখানকার কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, প্রতি বছর তিনবার চণ্ডীমুড়ায় ভক্তবৃন্দের সমাবেশ ঘটে। কার্তিক মাসের কালীপূজার সময় দেওয়ানি উৎসব, পৌষ-মাঘ মাসে গীতা সম্মেলন এবং ফালগুন-চৈত্র মাসে বাসন্তী মহাঅষ্টমী। আশ্রমের লোকজনসহ আগত ভক্তবৃন্দের বিশ্বাস-মা চণ্ডী দেবীর কৃপা থেকে কেউ খালি হাতে ফেরে না। ১৯৫৫-৫৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রত্নতাত্তি্বক বিভাগ লালমাই-ময়নামতিতে জরিপ চালিয়ে কুমিল্লার প্রত্নতাত্তি্বক যে ৫৪টি স্থান সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট করে তার মধ্যে চণ্ডীমুড়া অন্যতম।

মহিউদ্দিন মোল্লা, কুমিল্লা 
Ref: http://www.bangladesh-pratidin.com/index.php?view=details&type=gold&data=Software&pub_no=247&cat_id=3&menu_id=16&news_type_id=1&index=2

হেলেন কাহিনী (দ্য বিউটি কুইন অব স্পার্টা)

খ্রিস্টপূর্ব ১২১৪ অব্দে জিউস ও লিডার ঘর আলোকিত করে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে ছোট অথচ ফুটফুটে একটি শিশু। বাবা জিউস কন্যাশিশুর কথা শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান। মা লিডা বারবার চুমো খেতে থাকে ছোট কন্যাশিশু কপালে।

শিশুটির নাম কি রাখা হবে এ নিয়ে যখন সবাই ব্যস্ত, তখন এক জ্যোতিষী শিশুটির নাম রাখলেন হেলেন! আর বললেন নামের কারণেই মেয়েটি পৃথিবীতে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।



প্রাচীনকালে গ্রিক বিভিন্ন রাজ্যে বিভক্ত ছিল_ স্পার্টা, আর্পস ছিল তার অন্যতম। স্পার্টার রাজার নাম ছিল মেনিলাস, আর্পসের রাজার নাম ছিল আগামেনন। মেনিলাস ও আগামেনন সম্পর্কে ছিল আপন ভাই। মেনিলাসের ছিল একাধিক স্ত্রী। একাধিক স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও সে ছিল ভয়ানক নারীলোভী।

অন্যদিকে জিউসের কন্যা হেলেন আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হেলেনের রূপ-লাবণ্য আর আকর্ষণীয় চাহনির সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এক সময় স্পার্টার রাজা মেনিলাসের কানেও চলে আসে সেই খবর। হেলেনের জন্য পাগল হয়ে ওঠলেন মেনিলাস। প্রায় ৬০ জন প্রহরী নিয়ে হাজির হয় জিউসের বাড়িতে, রাজার অনুরোধ আর বিনয়ে মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি হয়ে যান জিউস! শুরু হয় নতুন অধ্যায়ের। মেনিলাস বয়সে ৪০ বছরের বড় হলেও জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন হেলেনকে। মেনিলাস হেলেনের জন্য প্রহরী নিযুক্ত করেন প্রায় ৮০ জন, তার গোসল, খাওয়া-দাওয়া, কাপড়-পরিধান এমনকি চুল আঁচড়ানোর জন্যও সেবিকারা থাকত সদাব্যস্ত। হেলেনের মুখের হাসি দেখার জন্য মেনিলাস নানা উপায় অবলম্বন করতেন, কখনো গোলাপ ফুল, কখনো দামি শাড়ি নিয়ে হাজির হতেন হেলেনের সামনে। নানা আয়োজনে হেলেনকে ভালোবাসতে চাইলেও হেলেন মোটেই ভালোবাসতেন না মেনিলাসকে! সব সময় ভিন্ন কিছু পাওয়ার আশায় উদাসীন থাকতেন হেলেন। কালেভদ্রে হাসি ফুটতো হেলেনের মুখে। নিজেকে সব সময় আড়ালে রাখতেই পছন্দ করতেন তিনি। নিজের মনের কথা কখনো কাউকে খুলে বলতেন না।

গ্রিক ও ট্রয় (বর্তমান তুরস্ক) পাশাপাশি দুটি রাষ্ট্র; কিন্তু মধ্যে ছিল এজিয়ান নামক বিখ্যাত সাগর। ১২৩০ সালের দিকে ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস ও হেক্টর আসে স্পার্টায় ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য। স্পার্টার রাজা মেনিলাস প্যারিস ও হেক্টরকে সাদরে সম্বোধন জানায়। তাদের আগমনে রাজ্যকে লাল-নীল বাতিতে চমৎকারভাবে সাজানো হয়। নৈশভোজের বিপুল সমারোহের পর প্যারিস ও হেক্টরকে সবার সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দেন রাজা মেনিলাস। এক পর্যায়ে হেলেনের সঙ্গে পরিচয় ঘটে রাজপুত্র প্যারিসের। ব্যবসায়িক আলোচনার জন্য স্পার্টায় বিশদিন থাকার প্রয়োজন হয়ে পড়ে প্যাসিস ও হেক্টরের। হেক্টর ও মেনিলাস বেশি ব্যস্ত থাকতেন ব্যবসা-বাণিজ্যের চুক্তি নিয়ে। আর গোপনে সবার চক্ষুর আড়ালে প্যারিস দেখা করতেন হেলেনের সঙ্গে। প্যারিসের চেহারা, গায়ের গড়ন, শরীর কাঠামো সবকিছুই হেলেনকে বিমোহিত করে, প্রথমে রাজি না থাকলেও আস্তে আস্তে প্যারিসের প্রতি প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়েন হেলেন। যাই হোক নির্ধারিত সময় শেষে ট্রয়ে ফিরে যাবেন হেক্টর ও প্যারিস। ভোর হলেই তারা রওনা দেবেন ট্রয়ের উদ্দেশে। রাজা মেনিলাসের আপ্যায়নের কোনো কমতি নেই। খাবার-দাবার আর সুন্দরী রমনীদের নাচের দৃশ্য সাজিয়েছে শেষ নৈশভোজ। নর-নারী, প্রহরী ও হেক্টর, রাজা ও ট্রয়ের অতিথিরা যখন আমোদ-প্রমোদ আর নাচ-গান নিয়ে ব্যস্ত তখন প্যারিস গোপনে চুপিসারে যান হেলেনের ঘরে। নিবিড় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে একে অপরকে, ভালোবাসার মধুর রসসিক্ত হয় উভয়ের মণ, প্রাণ ও দেহ। এজিয়ান সাগরের মাঝপথে এসে প্যারিস হেক্টরকে বলেন, হেলেন তাদের সঙ্গে এসেছেন। প্যারিসের কথা শুনে অবাক হয়ে যান হেক্টর! রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে চটে যায় প্যারিসের ওপর। নাবিকদের বলে জাহাজ স্পার্টার দিকে ঘুরাতে। কিন্তু প্যারিসের অনুরোধে আর ক্রন্দনে হেক্টর নিজের মত পরিবর্তন করেন। এদিকে স্পার্টার রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে প্যারিস হেলেনকে অপহরণ করে ট্রয়ে নিয়ে গেছে। মেনিলাস পাগলের মতো হয়ে সাহায্যের জন্য হাত বাড়ান আপন ভাই আর্পসের রাজা আগামেননের। আগামেনন গ্রিসের সম্মান ফিরিয়ে আনার জন্য গ্রিসের সব রাজাকে অনুরোধ জানান। প্রায় ১ হাজার জাহাজ নিয়ে ট্রয়ের উদ্দেশে রওনা দেয় গ্রিসবাসী। ট্রয়ে হাসি-আনন্দ ভালোবাসার জীবন আর যৌবনের পূর্ণতা পায় সুন্দরী হেলেন। ট্রয়ে বয়ে যায় হেলেনময়। প্রতিদিন শত শত উপহার উপঢৌকন আসতে থাকে হেলেনের ঘরে। প্যারিস নিজের জীবনের স্বার্থকতা আর ভালোবাসার স্পষ্টতা খুঁজে পায় হেলেনের হৃদয়ে। ভালোবাসার অতল সমুদ্রে ভাসতে থাকে প্যারিস আর হেলেন। হঠাৎ রাজ্যময় বিপদ ঘণ্টা বাজতে থাকে। রাজ্যের প্রজারা-বিপদ সংকেতে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। রাজ্য থেকে হেক্টর ও তার বাবা দেখতে পায় হাজার হাজার জাহাজ নিয়ে গ্রিকরা ধেয়ে আসছে ট্রয়ের দিকে। মুহূর্তে কালো মেঘ নেমে আসে হেলেনের চোখে-মুখে। গোপনে রাতে ট্রয় থেকে পালিয়ে যেতে চান হেলেন। কিন্তু ধরা পড়ে হেক্টরের হাতে। হেক্টর তাকে সাহস দেয়। এতে ট্রয়ে থেকে যান হেলেন। জাহাজ থেকে সর্বপ্রথম নামেন গ্রিকবীর একলিস। নেমেই যুদ্ধ শুরু করেন একলিস ও তার সঙ্গীরা। প্রথম যুদ্ধেই ট্রয়নগরীর বন্দর দখল করেন নেয় গ্রিকরা। এভাবে টানা ১০ বছর বন্দর ও রাজ্য অবরোধ করে রাখে গ্রিকরা। বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধে নিহত হয় একলিসের ভাই উইরোরাস, প্যারিসের বড় ভাই ট্রয়বীর হেক্টর ও নাম না জানা উভয়পক্ষের হাজারও যোদ্ধা। যুদ্ধে সহজে জয়লাভ না করতে পেরে গ্রিকরা প্রতারণার আশ্রয় নেয়। তৈরি করে বিশাল আকৃতির ঘোড়া। যার নাম ট্রোজেন হর্স। ঘোড়ার মধ্যে লুকিয়ে রাখে শত শত সৈন্য। উপহার হিসেবে পাঠায় ট্রয় রাজার কাছে। রাজ্যের বাইরে লুকিয়ে থাকে গ্রিকরা কিন্তু এসবই অজানা থাকে ট্রয়বাসীর কাছে।

মহা-আনন্দে আর উৎসাহে ঘোড়াটিকে রাজ্যের ভেতরে নেয় ট্রয়বাসী। কিন্তু বিধি বাম, গভীর রাতে ঘোড়া থেকে বের হয়ে ট্রয়বাসীর ওপর অতর্কিত হামলা চালায় গ্রিকরা। গ্রিক সৈন্যরা ট্রয় রাজ্যে ধরিয়ে দেয় আগুন। মুহূর্তের মধ্যে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে ট্রয়নগর। আগুনে পুড়ে হাজার হাজার সৈন্য আর নিরীহ নাগরিক মারা যায় কয়েক। একলিস ছুটে যায় হেলেনকে বাঁচানোর আশায়; কিন্তু প্যারিস তীর বিদ্ধ করে মেরে ফেলে একলিসকে। পালিয়ে যায় হেলেন, জয়লাভ করে গ্রিকরা। কিন্তু যে হেলেনের জন্য এত কিছু তাকে মেনিলাস কাছে পেয়েছিল কিনা তা আজও অজানা। 
 মো. রিয়াজুল ইসলাম
Ref: http://www.bangladesh-pratidin.com/index.php?view=details&type=gold&data=Soccer&pub_no=247&cat_id=3&menu_id=16&news_type_id=1&index=0