Wednesday, April 6, 2011

জলে ভাসা জীবন


'রানী সালাম বারে বার/নামটি আমার গয়া বাইদ্যা বাবা থাকি পদ্মার পাড়' এটি পদ্মা, যমুনা, বড়াল, ধলেশ্বরী, ইছামতি, শীতলক্ষ্যা অথবা তুরাগের বুকে বসতি গড়ে ওঠা সম্প্রদায়ের যাযাবর জীবনের গল্প। লিখেছেন

_ সিরাজ প্রামাণিক



বেদেদের জীবনের গতিপথ তাবিজ-কবজ, জাদুটোনা আর সাপের খেলা দেখানোর নেশাতেই মিলেমিশে থাকে। সাপের খেলা দেখানো বেদে সম্প্রদায়ের আদি পেশা। যুগ যুগ ধরে জীবিকার অন্বেষণে তারা একমাত্র এ পেশাকেই আঁকড়ে ধরে আছে। সাপ খেলা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেলে এ সম্প্রদায়ের অপমান হবে, এ ভেবেই বংশ পরম্পরায় এ পেশাকে যে কোনো মূল্যে ধরে রাখতে চায় তারা। এই সাপের খেলা দেখাতে গিয়ে অনেক সময় তাদের মৃত্যুও ঘটে। সাপের বিষনালি বন্ধ করে, সিরিঞ্জ দিয়ে বিষ তুলে এনে তারা সাপের খেলা দেখায়। তবে মাঝে মাঝে এটি খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়। ভালোভাবে বিষ নামাতে না পারলে সাপের ছোবলে অনেকে মারাও যায়। যাযাবর বলেই তাদের জীবন বৈচিত্র্যময়। বেদেসমাজ মাতৃতান্ত্রিক। বেদে নারীরা যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করে। উপার্জন, বিয়ে ও সন্তান প্রতিপালনে তারাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। বেদে পুরুষরা অলস। কায়িক পরিশ্রমকে তারা ঘৃণা করে। ফলে সংসারের ব্যয় নির্বাহের জন্য বেদে মেয়েদেরই ঘর থেকে বের হতে হয়। বেদেরা সাধারণত নদীর আশপাশে সমতল ভূমিতে মাচা করে বসবাস করে। তবে নৌকায় বসবাসই তাদের ঐতিহ্য। তারা এক জায়গায় বেশিদিন থাকে না। নৌকা করে গ্রামগঞ্জে পরিভ্রমণ করে। বিশেষ করে ফসল ওঠার মৌসুমে ও হাটবার তারা বেশি যায়। বেদে নারীরাই দলবদ্ধভাবে এই পরিভ্রমণে যায়। এ সময় তাদের সঙ্গে সাপের ঝাঁপি ও ওষুধের ঝুলি থাকে। হাটবাজারে সাপের খেলা দেখিয়ে এবং ওষুধ বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে। তাছাড়া দাঁতের পোকা বের করা, শিঙ্গা ফুঁকা, শরীরে উল্কি এঁকেও তারা আয় করে। এ সময়ে বেদেনিরা বেশ সাজগোছ করে, কোমরে বিছা লাগায়, শরীরে ইমিটেশন গহনা পরে, খোঁপায় ফুল গুঁজে রাখে। মানুষকে আকর্ষণ করার জন্যই এমন সাজগোজ করে। অর্থ উপার্জনের পর ফেরে নিজ ডেরায় স্বামী-সন্তানের কাছে। বেদেরা সাধারণত সাপ ধরে। বনজঙ্গল, ঝোপঝাড় থেকে পুরুষ বেদেরা সাপ ধরে নিয়ে আসে। বেদেনিরাও সাপ ধরতে পারে। ডোরা সাপ, ঘর চিতি, লাউডগা ইত্যাদি বিষহীন সাপ সাবলীলভাবে ধরতে পারে। তবে সবাই সাপ ধরতে পারে না। উগ্র মেজাজের এবং ভয়ঙ্কর বিষাক্ত দাঁড়াশ, কালকেউটে, গোখরা, শক্সিখনীজাতীয় সাপ তারা অন্য বেদের কাছ থেকে কিনে নেয়। উপার্জন মৌসুম শেষ হলে বেদে পরিবারে বিয়ের আয়োজন করা হয়। বিয়ে করতে হলে কনেকে অর্থ দিতে হয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অন্য কোনো কারণে ছাড়াছাড়ি হলে সম্পত্তি, পুত্র, কন্যাও ভাগাভাগি হয়। সর্দাররা বিচার করে যা রায় দেয় উভয়পক্ষকে তা মেনে নিতে হয়। বিয়ের রাতে স্বামীকে সন্তান পালনের জন্য প্রতিজ্ঞা করতে হয়। যতদিন স্ত্রী উপার্জনের জন্য বাইরে থাকে ততদিন স্বামী-সন্তান প্রতিপালন করে। বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীর ঘরে যায়। স্ত্রীর ঘরই স্বামীর ঘর।

বেদেদের জীবন-জীবিকা আবর্তিত হয় পানি আর নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে মিলে। নৌকার পাটাতনেই তাদের জন্ম-মৃত্যু আর সেখানেই তাদের বসবাস। পানির সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতেই বেড়ে ওঠে বেদেশিশু। জীবনের অলিগলি পেরিয়ে পানিই তাদের পরম বন্ধু। ভোরের আলো ফুটে না ওঠতেই তাদের জীবন-সংগ্রাম শুরু হয়। সমাজের লৌকিক প্রথা অনুযায়ী একদিন খাদ্য অন্বেষণে না গেলে তাদের জন্য চরম অমঙ্গল। তাই তারা প্রকৃতির শত বৈরী আবহাওয়া মধ্যেও খাদ্য অন্বেষণে যায়। বেদে সম্প্রদায় গোষ্ঠীবদ্ধ যাযাবর জীবনযাপনে অভ্যস্ত। এরা বহর নিয়ে সরদারের নেতৃত্বে ঘুরে বেড়ায় একস্থান থেকে অন্যস্থানে। বেদেদের প্রতিটি পরিবারের জন্যই পৃথক নৌকা রয়েছে। তাদের ব্যবহৃত নৌকা সাধারণত ১০-১২ হাত লম্বা হয়। কেউ কেউ এরচেয়ে বড় নৌকাও তৈরি করে। তবে তা নির্ভর করে আর্থিক সামর্থের ওপর। নৌকাকে তারা নাও বা ডিঙ্গি বলে। পরিবারের প্রতিটি সদস্য নৌকা চালনায় দক্ষ। এক সময়ে শাল ও সুন্দরী কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরি করা হতো। কিন্তু এসব কাঠের দাম খুব বেশি হওয়ায় অধিকাংশ নৌকা এখন রেইনট্রি অথবা চাম্বল কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। নৌকাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে তাদের আলাদা এক রাজ্য, এক পৃথক ইতিহাস। নৌকানির্ভর জীবনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার প্রবণতা তাদের মধ্যে খুব কম। ভিন্নতর সংস্কৃতি নিয়ে গভীর মমতায় ভাসমান জীবনব্যবস্থা আঁকড়ে থাকলেও নদীর বুকেও তাদের স্থিতি নেই। আজ এক ঘাটে তো কাল আরেক ঘাটে। বেদেদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা। ধর্ম ইসলাম কিন্তু কেউ কেউ পূজা-অর্চনায়ও বিশ্বাসী। রাষ্ট্রের বিমুখতা আর স্থলভূমির মানুষের বৈরিতা, শূন্যতায় ভরে দিয়েছে বেদেদের জীবনের অমিত সম্ভাবনাকে। তবু মাটির স্পর্শজাগা পৃথিবীতে বাঁচার স্বপ্নে বিভোর থাকে তারা। নদীর অন্ধকার গর্ভে আরও ঘনীভূত অন্ধকারাচ্ছন্ন তাদের জলজীবন। এ জলযাত্রা মাটি আর আকাশকে অচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়ায় না। পানি, মাটি আর আকাশ এক সঙ্গে জিইয়ে রাখে তাদের সীমাহীন দুঃখ।

Monday, February 28, 2011

কবি চন্দ্রাবতী ও সেই শিবমন্দির




চন্দ্রাবতী (১৫৫০-১৬০০) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম বাঙালি মহিলা কবি। তার পিতা 'মনসামঙ্গল' কাব্যের অন্যতম রচয়িতা দ্বিজবংশী দাশ এবং মা সুলোচনা। জন্ম ষোড়শ শতাব্দীতে। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জের পাটোয়ারী গ্রামে। তার স্মৃতিবিজড়িত পাটোয়ারী গ্রাম আজও আছে। কিশোরগঞ্জ শহর থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে ওই গ্রাম। আর আছে ফুলেশ্বরী নদীর তীরে অবস্থিত চন্দ্রাবতীর শিবমন্দির।



ষোড়শ শতকের মনসামঙ্গলের বিখ্যাত কবি দ্বিজবংশী দাশের কন্যা ও বাংলার আদি মহিলা কবিরূপে খ্যাত চন্দ্রাবতী পূজিত ও বহু কাহিনী সম্পৃক্ত এ মন্দিরটি খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দিতে নির্মিত। নয়ন ঘোষ প্রণীত পালাগান 'চন্দ্রাবতী' থেকে জানা যায়, চন্দ্রাবতীর সঙ্গে বিয়ের কথা ছিল ছোটবেলার সাথী ও প্রেমিক জয়ানন্দের। কিন্তু জয়ানন্দ এক মুসলমান নারীর প্রেমে পড়ে ধর্মান্তরিত হন। এতে চন্দ্রাবতীর হৃদয় ভেঙে যায়। পরে পিতা দ্বিজবংশী দাশের কাছে চন্দ্রাবতী দুটি প্রার্থনা করেন_এক. ফুলেশ্বরী নদীর তীরে মন্দির প্রতিষ্ঠা করা এবং খ. চিরকুমারী থাকার ইচ্ছা। তার রচনাগুলোর মধ্যে মলুয়া, দস্যু কেনারামের পালা ও রামায়ণ কথা (অসমাপ্ত) অন্যতম। মৈমনসিংহ গীতিকায় তার কথা পাওয়া যায়। তার নিজের জীবনের ট্র্যাজেডি নিয়ে রচিত লোকগাথা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবিভক্ত ময়মনসিংহ জেলার মানুষের মুখে মুখে ফিরে এসেছে। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মাইজখাপন ইউনিয়নের কাচারিপাড়া গ্রামে কবি চন্দ্রাবতীর সুবিখ্যাত শিবমন্দিরটির অবস্থান। পুরাকীর্তির দিক থেকে কিশোরগঞ্জের দর্শনীয় নিদর্শনের মধ্যে যে নামগুলো প্রথমেই আসে তার মধ্যে কবি চন্দ্রাবতীর শিবমন্দির অন্যতম।

চন্দ্রাবতী পালায় তার বর্ণনা : 'অনুমতি দিয়া পিতা কয় কন্যার স্থানে শিবপূজা কর আর লেখ রামায়ণে।' এভাবেই এক সময়ের খরস্রোতা নদী ফুলেশ্বরীর তীরে শিবমন্দিরটি স্থাপিত হয়। এক সময় জয়ানন্দ ভুল বুঝতে পেরে চন্দ্রাবতীর কাছে ফিরে আসেন। কিন্তু চন্দ্রাবতী তাকে গ্রহণ করেননি। অন্তর্জ্বালায় একসময় জয়ানন্দ ফুলেশ্বরী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। বর্তমানে নদীটির কোনো চিহ্ন নেই। কিন্তু মন্দিরটি এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দীনেশ চন্দ্র সেন 'মৈমনসিংহ গীতিকা'য় লিখেছেন, 'চন্দ্রাবতী সম্ভবত ১৬০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।' তিনি আরও লিখেছেন_ পিতা ও কন্যা একত্রে মনসা দেবীর ভাসান ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে রচনা করেছিলেন। সে হিসেবে এবং মন্দির ও চন্দ্রাবতীর লেখায় রামায়ণ সম্পর্কে অন্যান্য আলোচনা, মন্দিরের নির্মাণশৈলী ও স্থানীয় অনুসন্ধান থেকে অনুমান করা হয়, মন্দিরটি ষোড়শ শতকের শেষ দিকে নির্মিত, যদিও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মন্দিরটি অষ্ট কোণাকৃতির। এর উচ্চতা ১১ মিটার। আটটি কোণার প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ ১.৭ মিটার। নিচের ধাপে একটি কক্ষ ও কক্ষে যাওয়ার জন্য একটি দরজা রয়েছে। ভেতরে হয় শিবপূজা। নিচের সরলরেখায় নির্মিত অংশটি দুটি ধাপে নির্মিত। নিচের ধাপের চারদিকে প্রায় অর্ধ বৃত্তাকার খিলানের সাহায্যে নির্মিত প্রশস্ত কুলুঙ্গি রয়েছে। নিচের ধাপে কার্নিশ পর্যন্ত উচ্চতা ২.৭০ মিটার। কক্ষের ভেতরে সাতটি জানালাসদৃশ কুলুঙ্গি রয়েছে যার প্রস্থ ৫২ সেন্টিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ৯৯ সেন্টিমিটার। এতে কিছু কারুকাজও আছে। কক্ষের ব্যাস ২.৩৫ মিটার। দ্বিতীয় ধাপটিও সরলরেখায় নির্মিত। এ পর্যায়েও অর্ধ বৃত্তাকারের খিলানের সাহায্যে নির্মিত প্রশস্ত কুলুঙ্গি রয়েছে। কুলুঙ্গির ভেতরে একদা পোড়ামাটির অসংখ্য চিত্র ফলকের অলঙ্করণ ছিল যা আজ অবশিষ্ট নেই। মন্দিরটি প্রায় ভগ্ন অবস্থায় ছিল। কয়েক বছর আগে প্রত্নতাত্তি্বক বিভাগ মন্দিরটির সংস্কার করেছে। ১৯৯১ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে মন্দিরের অনেক ক্ষতি হয়। এবং শিবলিঙ্গটিও চুরি হয়ে যায়। বর্তমনে মন্দিরটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সম্পত্তি। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এ বিষয়ে শুধু একটি সাইনবোর্ড টানিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে। এর রক্ষণাবেক্ষণসহ নিরাপত্তার বিষয়টি এখন হুমকির মুখে। মন্দিরে যাওয়ার রাস্তাটিও কাঁচা। ফলে দূর-দূরান্তের অনেক দর্শনার্থী সহজে মন্দিরটি দেখতে যেতে পারেন না।

সাইফউদ্দিন আহমেদ, কিশোরগঞ্জ 

মুলসুত্র: http://www.bangladesh-pratidin.com/?view=details&type=gold&data=Economics&pub_no=303&cat_id=3&menu_id=16&news_type_id=1&index=0

Monday, January 10, 2011

আলপনা কথন



আলপনা, এক ধরনের লোকশিল্প এবং মানুষের সহজাত অভিব্যক্তি বলা যায়। এতে সমাজের অতীত অভিজ্ঞতা যেমন প্রকাশ পায়, তেমনি একই সঙ্গে ফুটে ওঠে বর্তমানের অস্তিত্ব। প্রধানত মহিলারাই এ লোকশিল্পটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তারা একই সঙ্গে বহু পুরনো ঐতিহ্য যেমন ধরে রেখেছে, তেমনি নতুন আঙ্গিক ও বর্ণের সংযোজনেও এ শিল্প হয়েছে সপ্রতিভ। প্রকৃতির রূপ বদলের সঙ্গে তারা যেমন পরিচিত, তেমনি তাদের সৃজনশীলতাও ঋতুচক্রকে দেয় পৃথক মাত্রা। বাংলার মহিলারা বেশ কয়েকটি ব্রত পালন করেন। এ ব্রত পালনে কাদামাটির প্রকৃতি ও আলপনা একটি প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ হিসেবে চলে আসে। পূর্বসূরিদের কাছ থেকে শেখা নকশায় তারা অলঙ্কৃত করে তোলে তাদের গৃহ, রাঙায় ঘরের দেয়াল। প্রচলিত রীতির সঙ্গে প্রায় প্রত্যেকেই স্বীয় মনের মাধুরী মিশিয়ে সৃষ্টি করে কল্পনার আপন ভুবন। সাধারণ চালের গুঁড়ার পিটালির মধ্যে ছোট এক টুকরা কাপড় চুবিয়ে নিয়ে এ নকশা করা হতো। সম্ভবত সাদা চালের গুঁড়া ছিটিয়ে অথবা ছড়ানো চালের গুঁড়ার আস্তরণের উপরে দাগ কেটে আলপনা করা হতো। আলপনা শব্দটির উৎপত্তি সম্ভবত সংস্কৃত 'আলিমপনা' থেকে। এর অর্থ প্লাস্টার করা অথবা প্রলেপ দেওয়া। কোনো কোনো পণ্ডিতের মতে, আলপনা শব্দটি সম্ভবত এসেছে 'আলিদোনা' থেকে। এর অর্থ আইল অথবা বাঁধ দেওয়া। প্রাচীন কোনো শিল্পবিষয়ক গ্রন্থে আলপনার উল্লেখ পাওয়া যায় না, যদিও কোথাও কোথাও রঙ্গবলীর উল্লেখ পাওয়া যায়। রঙ্গবলী দ্বারা রং করা লতানো নকশা বোঝায়। এ শিল্পের বর্ণনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, রঙ্গবলী ছিল এক ধরনের আলপনা। আলপনা শিল্পের কাল নিরূপণ করা কঠিন। অনেক পণ্ডিতই ব্রত ও পূজার সঙ্গে সম্পর্কিত আলপনাকে প্রাক-আর্য সময়কালের উৎপত্তি বলে চিহ্নিত করেন। কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন যে, আমরা আলপনার উত্তরাধিকার লাভ করেছি অস্ট্রিক জাতির কাছ থেকে। যারা আর্যদের আগমনের অনেক আগ থেকেই এ দেশে বাস করত। তাদের মতে, ধর্মীয় আচার সংবলিত ও ঐতিহ্যগত লোকশিল্পসমূহ, প্রকৃতপক্ষে কৃষি যুগে শস্যের প্রচুর উৎপাদন ও অপদেবতা বিতাড়নের নিমিত্তে উদ্ভূত। সে সময় নকশার মূল উপাদান ছিল চালের গুঁড়া, পানিতে গোলানো চালের মণ্ড, শুকনো পাতা গুঁড়ো করে তৈরি রংয়ের গুঁড়া, কাঠকয়লা, পোড়ামাটি ইত্যাদি। সাধারণত মেঝের উপরই আলপনা করা হতো। স্মরণাতীতকাল থেকেই বাংলার মহিলারা ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানাদির উদ্দেশ্যেই এ নকশার অনুশীলন করে আসছেন। বিভিন্ন প্রজন্মের চিত্রকরদের সুবিধার্থে আলপনার উপস্থাপনা ব্যাপকভাবে যুগের প্রচলিত রীতিতে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। তারপরও আলপনা তার ঐতিহ্যগত বেশিষ্ট্য প্রকাশ করতে সক্ষম। আলপনার স্বাতন্ত্র্য ও একই রূপ এঁকে দিয়েছে একটি সূক্ষ্ম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। গোলাকৃতির আলপনা দেবীর পূজায়, বিশেষ করে লক্ষ্মীপূজায় পবিত্র বেদি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আলপনায় ব্যবহৃত মোটিভগুলো হলো_ সূর্য, ধান গাছ, পেঁচা, মই, লাঙল, লক্ষ্মীর পা, মাছ, পান, পদ্ম, শক্সখলতা, সিঁদুরকৌটা ইত্যাদি। বাংলার আলপনার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিমূর্ত, আলঙ্কারিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমান যুগে মুসলমানরাও বিয়ে ও অন্যান্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আলপনা অঙ্কন করে থাকেন। একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও মিনার সংলগ্ন সড়কগুলোতে এবং নববর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা এবং অন্যান্য স্থানে প্রচুর আলপনা তৈরি করা হয়। এটি সত্য যে, বাংলাদেশে আলপনা একটি অসাম্প্রদায়িক চরিত্র হিসেবে বিবেচিত।

শামীম রহমান রিজভী 
Ref: http://www.bangladesh-pratidin.com/?view=details&archiev=yes&arch_date=09-01-2011&type=gold&data=Cricket&pub_no=253&cat_id=3&menu_id=16&news_type_id=1&index=1

ইংরেজি শব্দের উৎস সন্ধান


সব ভাষার মিলনকেন্দ্র বলতে সাধারণত ইংরেজি ভাষাই বুঝি। কেননা ইংরেজি ভাষা নিজের প্রয়োজনে প্রায় সব ভাষা থেকে কিছু না কিছু শব্দ গ্রহণ করেছে। সাম্রাজ্যবাদী ভাষা হিসেবে ইংরেজির বদনাম থাকলেও ইংরেজি শব্দের প্রকাশ ক্ষমতা অন্য ভাষার চেয়ে অনেক বেশি। তাই আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবেও ইংরেজি ভাষার পরিচয় ব্যাপক।

ইংরেজি ভাষার সঙ্গে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। অনেক শব্দের অর্থ আমরা সহজেই বলতে পারি কিন্তু এসব শব্দের উৎসটা কোথায় এ প্রশ্ন করলে অনেকে যে চুপ করে থাকবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। অথচ এসব শব্দের মূলে গিয়ে দেখা যায় বিস্ময়কর সব কাহিনী। এ লেখাটির মাধ্যমে আমরা খুবই পরিচিত কিছু ইংরেজি শব্দের উৎস খুঁজব। ফলে শব্দগুলো আমাদের কাছে একেবারে আপনজনের মতো হয়ে উঠবে।

School : এই শব্দের মূল অর্থটা জানলে আজকের যুগের ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনাই বন্ধ করে দিতে চাইবে।

School শব্দটা এসেছে গ্রিক থেকে। যার অর্থ ছিল 'অবসরযাপন'। তখন এই শব্দটা দিয়ে এমন এক সময়কে বুঝানো হতো, যখন সৈন্যদের আর যুদ্ধে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কৃষক মুক্তি পেত কৃষি কাজ থেকে। ব্যবসায়ীর ব্যবসা বন্ধ, অর্থাৎ পুরোপুরি অবসরযাপন। ওই সময় স্কুলে গেলেও পড়াশোনার কোনো ঝামেলা ছিল না। বই সঙ্গে নিলেও সেটা না খুললেও চলত। এসব স্কুলে যাওয়ার সুযোগ মিলত ধনীর ছেলে-মেয়েদের। তারা ওইসময় গল্প-গুজবের মধ্য দিয়ে অনেক কিছু শিখে ফেলত। পরবর্তী সময়ে তারা ভালো চাকরি পেত।

এটা দেখে অনেক মা-বাবাই চাইলেন তাদের ছেলেমেয়েরাও স্কুলে যাক। সময়ের পরিক্রমায় School হয়ে উঠল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু, যা এক সময় ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। তবে যতদূর জানা গেছে, তখনকার সময়ের স্কুলে অবসর পাওয়া যেত মাত্র এক ঘণ্টা!

Salary : এক দৃশ্য কল্পনা করুন তো, মাসের প্রথম পাঁচ বা দশ তারিখে আপনার বস বেতন হিসেবে আপনাকে এক প্যাকেট লবণ দিলেন। কেমন লাগবে তখন আপনার? মাথা গরম হওয়ার মতো অবস্থা। শুধু আপনি নয়, সবারই এমনটা হওয়ার কথা। অথচ রোমান যুগে রোমান সৈন্যদের বেতন হিসেবে দেওয়া হতো লবণ। আর এই লবণ পেয়ে তাদের আনন্দ দেখে কে। লবণের ইংরেজি Salt থেকে পরবর্তী সময়ে Salary শব্দটি এসেছে। শুধু বেতন হিসেবে আমাদের আর লবণ দেওয়া হয় না, এই পার্থক্যটুকুই কেবল রয়ে গেছে।

Shampoo : এ শব্দটি এসেছে হিন্দি ভাষা থেকে। যার অর্থ হচ্ছে to press or massage। ইংরেজরা ভারতবর্ষে আসার পর এ শব্দটি তাদের খুব পছন্দ হয়। ফলে শব্দটি এখন ইংরেজি শব্দ ভাণ্ডারের অন্যতম।

Cosmetic : এ শব্দটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় মেয়েদের রূপসজ্জার হরেকরকম সামগ্রীর কথা। Cosmetic শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ Cosmos থেকে। আর Cosmos-এর মানে যে কী, তা পরখ করার জন্য অভিধানটি একবার খুলেই দেখুন না, আপনার বিস্ময়ের সীমা থাকবে না।

Bank : এ শব্দটি এসেছে ইতালিয়ান ভাষা থেকে। তবে তখন শব্দটির মানে ছিল বর্তমানে প্রচলিত অর্থ থেকে ভিন্ন। তখন Bank মানে বুঝানো হতো 'moneychanger' এর টেবিলকে। মধ্যযুগীয় ইতালির প্রত্যেক শহরে প্রচলিত ছিল আলাদা আলাদা মুদ্রা। যেমন মিলান থেকে একজন মানুষ ফ্লোরেন্সে এলে তাকে প্রথমে ফ্লোরেন্সের মুদ্রা কিনতে হতো।

আর moneychanger-এর কাছে নানা শহরের মুদ্রা পাওয়া যেত। পৃথিবীর টাকা-কড়ির ইতিহাসে moneychanger এবং তার টেবিলটার গুরুত্ব ছিল অনেক। কারণ পরবর্তী সময়ে এরা সুদে টাকা ধার দিত। অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেদের টাকা বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করত। আধুনিক যুগের Bank শব্দের পূর্ব নাম হলো moneychanger-এর টেবিল, কথাটি অবিশ্বাস্য হলেও একেবারেই সত্য।

আমিন রহমান নবাব 
Ref: http://www.bangladesh-pratidin.com/?view=details&archiev=yes&arch_date=09-01-2011&type=gold&data=Tax&pub_no=253&cat_id=3&menu_id=16&news_type_id=1&index=6