Monday, January 3, 2011

১২৫ বছরে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল

 
১৮৮৫ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার উদ্যোগে তাদের নিজস্ব ভূমিতে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠা। সে সময় নারায়ণগঞ্জে মাদ্রাসা, টোল থাকলেও ইংরেজি তো দূরের কথা, বাংলা শিক্ষারও কোনো স্কুল ছিল না। বলা চলে, এটিই গোটা নারায়ণগঞ্জ জেলায় বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষার প্রথম স্কুল এবং একমাত্র এন্ট্রান্স স্কুল। আর তাই এ স্কুলকে কেন্দ্র করেই প্রায় দীর্ঘ সময় পরিচালিত হয়েছে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় কর্মকাণ্ড। মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, ফরোয়ার্ড ব্লক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্মেলন-জনসভাসহ নানা কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়েছে এই স্কুলের বিস্তৃত প্রাঙ্গণে। শিক্ষা সম্মেলন ও সাহিত্য সম্মেলনও হয়েছে। এখানে এসেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ অনেকেই।
১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রবীন্দ্রনাথকে সংবর্ধনার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। তখন কলকাতা থেকে ঢাকায় যেতে প্রথমেই গোয়ালন্দ হয়ে স্টিমারে নারায়ণগঞ্জে আসতে হতো। গোয়ালন্দ থেকে নারায়ণগঞ্জ জলপথের দূরত্ব ১০০ মাইল। রবীন্দ্রনাথ যতবার ঢাকায় এসেছেন, এই নারায়ণগঞ্জের ওপর দিয়েই গিয়েছেন। ১৯২৬ সালে আগরতলা থেকে চাঁদপুর হয়ে স্টিমারে কবি নারায়ণগঞ্জে আসেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি সকাল নয়টা নাগাদ তিনি নারায়ণগঞ্জে এসে পৌঁছান। নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের ছাত্ররা স্টিমার ঘাটে কবিকে এবং তাঁর দলের সবাইকে অভ্যর্থনা জানায়। শত শত ছাত্র এখান থেকে শোভাযাত্রাসহ কবিকে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলে নিয়ে আসে। তখন স্কুল প্রাঙ্গণে এক সমাবেশে কবিকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশে রবীন্দ্র সংবর্ধনায় ভূঁইয়া ইকবাল কবিকে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলে দেওয়া সংবর্ধনায় প্রদানকৃত মানপত্রটি হুবহু তুলে ধরা হয়েছে। এ সংবর্ধনাপত্রে বলা হয়েছিল, ‘বিশ্ববরেণ্য কবিসম্রাট শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের শ্রীশ্রীচরণকমলেষু। দেব, পূর্ব্ববঙ্গের তোরণ-দ্বারে-পুণ্যসলিলা শীতলক্ষ্যার পবিত্র তীরে হে কবি! তোমাকে তোমার প্রত্যাবর্ত্তন-পথে স্বাগতম। অভিনন্দনের সুযোগ পাইয়া আমরা আপনাদিগকে কৃতার্থ মনে করিতেছি।...আমাদের এই বাংলাদেশ দেশে দেশে শুধু অন্নই বিতরণ করে না, দেশকে সুজলা-সুফলা ও শস্যশ্যামলা করিয়াই শুধু নদীর শুভ্র-রজতধারা তাহার গতিপথে অগ্রসর হয় না, তাহার কলপ্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানের পবিত্র আলোকধারাও লহরে লহরে দিগিদগন্তে ব্যাপ্ত করিয়া দিয়া আপনাকে মহিমান্বিত করিয়াছে, সে লুপ্তধারা ধূর্জ্জটির জটানিষ্যন্দী পবিত্রধারার ন্যায় তুমিই আবার বিশ্বভারতীর শান্তিনিকেতন হইতে প্রবাহিত করিয়া সমস্ত বিশ্ববাসীকে ভারতের বাণী নূতন করিয়া প্রচার করিতেছ। নালন্দা নাই, তক্ষশীলা নাই, বিক্রম শীলা নাই! তাহাতে দুঃখ কি? তোমার বিশ্ব-ভারতী অতীত ও বর্ত্তমানকে জাগ্রত করিয়াছে। আমরা তোমার সেই আদর্শ হূদয়ে গ্রহণ করিয়া লক্ষ্য পথে চলিতে পারি, আমাদিগকে সে আশীর্ব্বাদ কর...।’ তখন অমৃতবাজার পত্রিকায় হাইস্কুলের এই সংবর্ধনা সভার সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে উল্লেখ করা হয় যে ছাত্রদের পক্ষ থেকে কামাখ্যা চরণ সেন কবিকে স্বাগত জানিয়ে এক অভিনন্দনপত্র পাঠ করেন এবং অভিনন্দনের উত্তরে কবি নিজের ছাত্রজীবনের কথা উল্লেখ করেন। সংবর্ধনার উত্তরে রবীন্দ্রনাথ সেদিন বলেন, ‘লোকে চাকরি পাওয়ার জন্য নিজেকে শিক্ষিত করতে স্কুল-কলেজে পড়তে যায়। কিন্তু বর্তমানে চাকরির দরজা বন্ধ হওয়ায় শিক্ষিত লোকেরা স্বাধীন জীবিকার দিকে ঝুঁকছে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও কাজকর্মে এক পরিবর্তন এসেছে। এমন একটি সময় ছিল, যখন লোকে ভাবতেন, বক্তৃতা দিয়েই তাঁরা তাঁদের কাজ উদ্ধার করতে সক্ষম হবেন। তাঁরা পুরাতন অভ্যাসবশত এখনও ঐরূপ কাজ করে বসেন। কিন্তু বর্তমানে যুবসমাজ বাস্তব ও আসল কাজের দিকে তাকায়। বর্তমান আন্দোলনকালে যে উদ্দীপনা এসেছে, তাকে যেন তারা স্থায়ী করে। শান্তিনিকেতনে পূর্ববঙ্গের বহু ছেলে পড়ে। তাদের মধ্যে চরিত্রের দৃঢ়তা, একাগ্রতা ও শ্রদ্ধার ভাব দেখেছি। আমি পূর্ববঙ্গ ভ্রমণ করে দেখলাম, এটা একটা ভাল কর্মী সংগ্রহের স্থান। এখানকার ছেলেদের যে কাজেই লাগানো যাবে, তারা তাদের একাগ্রতা ও নিষ্ঠার দ্বারা কৃতকার্য হবেই। আমি যদি এখনও যুবক থাকতাম, তাহলে এখানে বক্তৃতা না করে হাতে-নাতে কাজে লেগে যেতাম। এখানকার উর্বরা মাটির মতই এখানকার মানুষের উদ্যম-আগ্রহও প্রবল। কিন্তু আজ আমার বয়স এবং স্বাস্থ্য দুই-ই নেই। আমার কর্মক্ষেত্র পশ্চিম বাংলার এক সীমান্তে অবস্থিত। সেখানকার মাটি উর্বরা নয় এবং মানুষও অনেকটা উদাসীন। পূর্ববঙ্গের এ অঞ্চলে উপযুক্ত পরিবেশে লোকে যদি তাদের কাজ আরম্ভ করে, তাহলে তারা অতি সহজেই সফলকাম হবে।...পূর্ববঙ্গে প্রকৃতি যেমন সৌন্দর্যে ও প্রাচুর্যে নিজেকে বিকশিত করেছে, এখানকার লোকদের মধ্যেও দেখেছি তেমন প্রাণ-প্রাচুর্য ও প্রাণের উদারতা। পূর্ববঙ্গের যুবকরা যদি তাদের এ অঞ্চলে গ্রামীণ কাজ আরম্ভ করে, তাহলে তারা নিশ্চয়ই সফলকাম হবে। উপসংহারে আমি ছাত্রদের আশীর্বাদ জানিয়ে বলব, তারা তাদের ত্যাগ ও নিষ্ঠার দ্বারা কাজ করলে শুধু বাংলাকেই নয়, সারা ভারতকেও আসল পথের সন্ধান দেবে।’
নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল ১২৫ বছরের ইতিহাস ধারণ করে চলেছে। এই দীর্ঘ সময়ে শত-সহস্র ছাত্র আলোকবর্তিকা নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছেন দেশে ও দেশের বাইরে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এন্ট্রান্স পরীক্ষার মেধাতালিকায় এ স্কুলের অবস্থান ছিল উল্লেখযোগ্য। আশা করতে দোষ কী, এই স্কুল থেকেই হয়তো একদিন বেরোবে আগামী দিনের কোনো এক কপালকুণ্ডলা। যিনি পথ দেখাবেন গোটা জাতি, সমাজ ও দেশকে। 
রফিউর রাব্বি | 
ref: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-12-30/news/119441

এক অসাধারণ মানুষের কথা

 
অধ্যাপক ড. এ আর মল্লিক আমার কাছে একটি অতি শ্রদ্ধেয় নাম। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের দীর্ঘকাল শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। শিক্ষকতাই ছিল তাঁর আজীবনের সাধনা। ১৯৪৮ সালের মার্চের সূচিত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের নেপথ্যে রাজশাহীতে যে কজন বুদ্ধিজীবী শিক্ষক বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক মল্লিক অন্যতম। ভাষাসৈনিক অ্যাডভোকেট মহসীন প্রামাণিক লিখেছেন, ‘ড. আবুল কাশেম চৌধুরীর কাছে জানতে পারি যে ড. মল্লিক ৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পাকিস্তান হাসিলের আনন্দমিছিল শেষে সন্ধ্যার সময় ১০-১২ জন ছাত্রনেতা তাঁর বাড়িতে যান, তখনই তিনি ইতিহাসবিদ হিসেবে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, “পাকিস্তান তো তোমরা হাসিল করলে, কত দিন পাকিস্তান টেকে, তাতে আমার সন্দেহ আছে।” যে পণ্ডিত ব্যক্তি পাকিস্তানের জন্মলগ্নেই এই ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন বা করার মতো সাহস রাখেন, তিনি প্রকৃত পণ্ডিত ও সাহসী। আমি এ ব্যাপারে ড. মল্লিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম এবং তিনি এ কথা স্বীকার করেন।’ (সূত্র: রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলন: স্মারকপত্র, সম্পাদক অধ্যাপক তসিকুল ইসলাম)।
আমাদের জাতীয় জীবনের মহত্তম ঘটনা রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নির্মাণে বুদ্ধিজীবীসমাজের মধ্যে ড. মল্লিকের নাম অগ্রগণ্য। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলনের (২-২৫ মার্চ ১৯৭১) সঙ্গে তিনি একাত্মতা প্রকাশ করেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি দ্বিধাহীনচিত্তে যোগ দেন। এ প্রসঙ্গে ড. মল্লিক তাঁর আত্মজীবনী আমার জীবন কথা ও বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম গ্রন্থে লিখেছেন, ‘নিজ পরিচয়ে নিজ দেশে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করব, নাকি পাকিস্তানিদের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকব—এ প্রশ্নের উত্তর দিতে আমাকে মুহূর্তের জন্য দ্বিধান্বিত হতে হয়নি।’ ১৯৬৬ সালে ড. মল্লিক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এ দায়িত্ব পালনকালেই শুরু হয় আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। নিজ কর্মক্ষেত্রে একজন সেনানায়কের মতো তাঁর নেতৃত্বে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এ সময় উপাচার্যের কার্যালয় হয়ে উঠেছিল বিশ্ববিদ্যালয় ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মুক্তিসংগ্রামের সদর দপ্তর। এখানে অধিনায়কত্ব করেছেন উপাচার্য ড. মল্লিক। একপর্যায়ে চট্টগ্রাম শহর পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে চলে গেলে তিনি ভারতে চলে যান। ড. মল্লিকের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশের সব পর্যায়ের বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন ‘লিবারেশন কাউন্সিল অব ইন্টেলিজেনসিয়া’, যেখানে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁর সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান। এ ছাড়া বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি গঠিত হলে ড. মল্লিক সভাপতি আর অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ভারতের সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের উদ্যোগে এবং গান্ধী শান্তি সংস্থার সহায়তায় আয়োজিত (১৮-২০ সেপ্টেম্বর ’৭১) ওয়ার্ল্ড মিট অন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার পরিমাণ আরও বাড়ানো এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন। এরপর ভারত থেকে মুজিবনগর সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সফর করেন। সেই সময়কালে আমেরিকা ও ইউরোপের ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতিসংঘে স্বাধীনতার অনুকূলে অকাট্য যুক্তি এবং পূর্ব বাংলায় সংঘটিত মানববিনাশী ও পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের চিত্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে তিনি স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করেন।
মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শুরু থেকে ড. মল্লিকের বিশ্বাস ছিল, মুক্তিযুদ্ধ সফল হবেই এবং ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশ স্বাধীন হবে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তাঁর স্মৃতিচারণায় উল্লেখ করেছেন, ‘১৫ এপ্রিল সকালে ড. মল্লিক, তাঁর বড় জামাই ড. জিয়া উদ্দিন আহম্মেদ, অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, ড. রশিদুল হক ও ড. মাহমুদ শাহ কোরেশীকে বিদায় জানালাম। আমি স্বভাবত ভাবপ্রবণ নই। কিন্তু যে মুহূর্তে তাঁরা দেশের মাটি থেকে পা তুলতে গেলেন, সেই মুহূর্তে কেঁদে ফেললাম। মল্লিক সাহেব আমার পিঠে হাত রেখে বললেন, “ডোন্ট ইউ ওরি। এ পথেই আমরা একসঙ্গে ফিরে আসব—বিফোর দি ইয়ার ইজ আউট।” কেন এবং কিসের জোরে কথাটা তিনি বলেছিলেন, জানি না। তবে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টায় তিনি এই বিশ্বাস লালন করেছিলেন এবং অন্যদেরও বলেছিলেন, “ডিসেম্বরের মধ্যে আমরা স্বাধীন দেশে ফিরে যাব।”’ (সূত্র: আমার একাত্তর, আনিসুজ্জামান)। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বলার মতো। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সফল একজন কূটনীতিবিদ। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু জাতিকে দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন। মুক্তিযুদ্ধের শত্রুপক্ষ পাকিস্তানি বাহিনী তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে চলে যাওয়ার আগ মুহূর্তে আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙেচুরে দিয়ে যায়, যাতে সমস্যার চাপে এবং অর্থনীতির বিপর্যয়ের ফলে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও এর অস্তিত্ব হয় বিপন্ন। বঙ্গবন্ধু সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে ড. মল্লিক দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচিকে সফল করার জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে তিনি অনেকটা সফল হয়েছিলেন। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড না ঘটলে এবং দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে দারিদ্র্যের বহুমাত্রিক সমস্যা দূর করে দেশ আরও অনেক দূর এগিয়ে যেত। জাতির জনক শেখ মুজিব সপরিবারে শহীদ হওয়ার দীর্ঘদিন পর ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে ড. মল্লিকের প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘যে দলটির ছত্রচ্ছায়ায় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে, সেটি আবার ক্ষমতাসীন হয়েছে, আর দুঃখ নেই, এখন শান্তিতে মরতে পারব।’ (সূত্র: আত্মজৈবনিক গ্রন্থ আলো ছায়ায় সাত পুরুষ, অধ্যাপক সৈয়দ মকসুদ আলী)। অধ্যাপক সৈয়দ মকসুদ আলীর ভাষায়, ‘তিনি বঙ্গবন্ধুকে প্রাণের চেয়ে ভালোবেসেছেন, বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসেছেন বলেই স্বদেশকেও ভালোবাসতে পেরেছিলেন।’ বঙ্গবন্ধুও তাঁকে খুবই শ্রদ্ধাপূর্ণ চোখে দেখতেন। ১৯৮৩ সালে সম্পূর্ণ বাঙালি মূলধনে বাংলাদেশি নাগরিকদের মালিকানায় ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হলে ড. মল্লিক প্রতিষ্ঠানটির প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান। আশির দশকে গঠিত শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সন্তানদের হাতে গড়া সংগঠন ‘প্রজন্ম ৭১’-এর প্রতি তিনি অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। এদের বিভিন্ন কার্যক্রমে মুক্তিযোদ্ধা এই বুদ্ধিজীবীর সমর্থন ও সহায়তা ছিল অপরিসীম।
১৯১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্ম আর ১৯৯৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পবিত্র লাইলাতুল কদরের রাতে ৭৯ বছরের বর্ণিল জীবনের ইতি টেনে দেহান্তরিত হয়েছেন। অসাধারণ মানুষ ড. মল্লিকের ৯৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর অমর স্মৃতির প্রতি নিবেদন করছি বিনম্র শ্রদ্ধা, সম্মান ও গভীর ভালোবাসা। জয়তু ড. এ আর মল্লিক। 
মাকসুদুল হক খান | 
মুলসুত্র: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-12-31/news/119667

Sunday, January 2, 2011

পিগমিরা খাটো কেন?


কঙ্গো উপত্যকা ক্রান্তীয় বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে মধ্যাহ্নে সূর্যরশ্মি প্রায় লম্বভাবে কিরণ দেয়। আর দিন ও রাত্রির পরিমাণও সারা বছর সমান থাকে। উওর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পশ্চিম অয়ন বায়ু নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের কাছে মিলিত হয়েছে। ফলে ইন্টার প্রপিক্যাল কনভাজেন্সের সৃষ্টি হয়েছে। এখানে প্রচণ্ড উত্তাপ। উত্তাপের আধিক্য এবং প্রচুর বাতাসে জলীয়বাষ্প এখানকার অধিবাসীদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। অত্যধিক উষ্ণতা এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় তা উদ্ভিদের পক্ষে অনুকূল। তাই এখানে গভীর অরণ্য সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু মাটি খুবই অনুর্বর। মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় এবং উত্তাপ খুব বেশি থাকার জন্য এখানকার মাটি দ্রুত ক্ষয় হয় এবং ধৌত প্রক্রিয়ার জন্য মাটির অধিকাংশ খনিজপদার্থ ভূ-অভ্যন্তরে চলে যায়। এখানকার উপজাতিদের খাদ্যে শর্করা এবং শ্বেতসার জাতীয় পদার্থের অভাব খুব বেশি থাকে। তাদের প্রধান খাদ্য ট্যাপিওকা, গাছগাছালির মূল, রাঙা আলু, ওল এবং চিনির দানা ও নিকৃষ্টমানের চাল। বাঁধাকপি, ফুলকপি, বীট, গাজর, শিম প্রভৃতির চাষ হয় না। তাই তাদের খাদ্যে ভিটামিনের বিশেষ করে প্রোটিনের পরিমাণ খুবই কম থাকে। বন থেকে শিকার করা পশুর মাংস ও মাছের পরিমাণও থাকে নামমাত্র_ যা শরীরের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে পারে। তাই এখানকার অধিবাসীদের খাদ্যে সুষম খাদ্যের যথেষ্ট অভাব দেখা যায়। ফলে অধিবাসীদের শারীরিক বৃদ্ধি ঠিকমতো হতে পারে না। অপুষ্টি রোগ ঘরে ঘরে আশ্রয় নেয়। তাই এখানকার মানুষ খর্বকায়। এদের গড় দৈর্ঘ্য চার ফুটেরও কম। 

ফারহানা মাহমুদ তন্বী 
মুলসুত্র: http://www.bangladesh-pratidin.com/?view=details&type=gold&data=College&pub_no=246&cat_id=3&menu_id=16&news_type_id=1&index=2

বাংলাদেশের পাখিশুমারি


চারপাশে নদী। মাঝেখানে জেগে ওঠা বিশাল চর। নির্জন এই চরে মানুষের কোনো বসতি নেই। তবে বসত করছে নানা প্রজাতির বর্ণিল রংয়ের ছোট-বড় হাজারও পরিযায়ী পাখি। আর এসব পাখি দেখার জন্য প্রতি বছর শীতকালে দলে দলে পাখিপ্রেমিক পর্যটক ছুটে যান উপকূলের চরগুলোতে। কেবল পাখি দেখার জন্যই নয়, তারা তুলে আনেন এসব পাখির সংখ্যা, পাখির জাত-প্রজাতি। আর ক্যামেরাবন্দী করেন এসব পাখির আলোকচিত্র, ভিডিও এবং কণ্ঠস্বর। তারপর মানুষকে জানিয়ে দেন পরিবেশ ও প্রকৃতির অনন্য বন্ধু এসব পাখির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে। আর এর মাধ্যমে তারা খুঁজে পান অন্যরকম আনন্দ।

পাখি দেখার এমন আনন্দ পেতেই গত বছরের ৭ জানুয়ারি বিকালে ঢাকা সদরঘাট থেকে একদল পাখিপ্রেমীর সঙ্গে লঞ্চযোগে রওনা দেই উপকূলীয় জেলা ভোলায়। উদ্দেশ্য উপকূলীয় জলচর পাখিশুমারি। দশজনের এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও পাখি নিয়ে গবেষণাকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়েটল্যান্ডস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয়কারী ইনাম আল হক। তার নেতৃত্বেই প্রতি বছর বাংলাদেশে জলচর পাখিশুমারি হয়ে থাকে। ৮ জানুয়ারি সকালে আমরা ভোলার ঘোষেরহাট লঞ্চঘাটে পেঁৗছাই। লঞ্চ থেকে নেমে ভাড়া করা ইঞ্জিনচালিত একটি নৌকায় রওনা হই চর ফ্যাশনের শাহজালাল চরের দিকে।

মেঘনা নদী দিয়ে নৌকা এগিয়ে চলে। মাঝে-মধ্যে দেখা যায়, ছোট পানচিল নদী থেকে মাছ তুলে নিচ্ছে। চোখে পড়ে জেগে ওঠা ছোট ছোট চর। আর সে চরে বসে আছে নানা রংয়ের নানা প্রজাতির পাখি। আমাদের পাখিপ্রেমীরা দুরবিন দিয়ে এসব পাখি দেখেন, ছবি তোলেন এবং খাতায় লেখেন এর সংখ্যা।

প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর নৌকা আসে শাহজালাল চরে। এই চরের এক পাশে বিশাল কেওড়া বন অন্যপাশে মেঘনা নদী। চরে নেমে বনের পাশেই শুকনো বালুতে আমরা রাতে থাকার জন্য ছোট-বড় চারটি তাঁবু তৈরি করি। তাঁবু তৈরি করতে করতে সন্ধ্যা নেমে আসে। সূর্য ডুব দেয় মেঘনায়। সন্ধ্যায় নদীর তীরে সবাই বসে চা খেতে খেতে পাখির গল্প শোনান ইনাম আল হক।

রাতে নিশিবকের ডাক শুনতে শুনতে ঘুমাই আর সকালে ঘুম ভাঙে বনের পাখির কিচিরমিচিরে। চরে ঘুমানোর এই প্রথম অভিজ্ঞতা। মনে হলো অন্যরকম ভালো লাগার কথা। প্রায় ১৫ বছর আগে এই চরটি জেগে ওঠে। তখন সরকারিভাবে একে বনায়ন করা হয়। সকাল সাতটার আগেই সবাই ঘুম থেকে উঠি। তৈরি হই পাখি দেখতে। নৌকায় রান্না করা গরম খিচুড়ি খেয়ে রওনা দিই পাখির খোঁজে। আমাদের কারও হাতে ক্যামেরা, কারও হাতে দুরবিন বা টেলিস্কোপ। কিংবা কারও হাতে শুমারির কাগজ, কেউ বা করছেন ভিডিও। বিশাল এই চরে প্রায় তিন কিলোমিটার হেঁটে কিংবা কখনো ছোট নৌকা করে দূরের ছোট্ট চরে গিয়ে আমরা দেখেছি ৪১ প্রজাতির প্রায় ১৪ হাজার পরিযায়ী পাখি। এসব পাখির মধ্যে আছে দেশি কানিবক, গো-বগা, মাঝলা বগা, ধুপনি বক, কালামাথা কান্তেচরা, পাতি চখাচখী, ইউরেশিও সিঁথিহাঁস, পাতি তিলিহাঁস, উত্তুরে লেঞ্জাহাঁস, উত্তুরে খুন্তেহাঁস, পাকড়া উল্টোঠুটি, ছোট নথজিরিয়া, কালালেজ, জৌরালি, নাটা গুলিন্দা, ইউরেশিও গুলিন্দা, ছোট পানচিল, ছোট পানকৌড়ি, ছোট বগা, বড় বগা, পিয়ং হাঁস, গিরিয়া হাঁস, প্রশান্ত সোনাজিরিয়া, মেটে জিরিয়া, পাতি লালপা, পাতি সবুজপা, পাতি বাটান, টেরেক বাটান, জুলফি পানচিল, খয়রামাথা গাঙচিল, কাসপিয়ান পানচিলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।

দলনেতা ইনাম আল হক টেলিস্কোপে এসব পাখি সবাইকে দেখান আর সেই সঙ্গে বলেন পাখির নাম, প্রজাতি, আবাসন, খাদ্যসহ বিভিন্ন বর্ণনা। সত্যিই নতুন নতুন পাখি দেখে, তার নাম শুনে খুঁজে পাই অন্যরকম আনন্দ। একটানা সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে পাখি দেখার কাজ। তারপর সন্ধ্যায় ফিরি তাঁবুতে। সারাদিন চরে রোদের মধ্যে কখনো বালুতে, কখনো কাদা মাটিতে কিংবা কখনো শক্ত ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে আমরা সবাই কিছুটা ক্লান্ত ছিলাম। তারপরও সবার মুখে ছিল নতুন পাখি চেনার আনন্দ। পরদিন সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে তাঁবু গুছিয়ে আমরা রওনা হই ঘোষেরহাট লঞ্চঘাটের উদ্দেশে। পথে আমরা পাখি দেখি ঢালচর, কলমীরচর ও এর আশপাশের ছোট ছোট চরগুলোতে। পেঁৗছাই বেলা তিনটায়। তারপর উঠি লঞ্চে। লঞ্চ ছাড়ে। পরদিন ভোরে আসি ঢাকায়। এর আগে ২০০৯ সালে আরও একবার গিয়েছিলাম উপকূলীয় এলাকায় জলচর পাখি শুমারি করতে। ১৬ থেকে ২৩ জানুয়ারি এই শুমারি অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের সঙ্গে ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী ড. রোলান্ড হালদার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাগ বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল খান, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের পাখি পর্যবেক্ষক এম এ মুহিত, সামিউল মোহসেনিন, সায়েম ইউ চৌধুরী ও সীমান্ত দীপু।

ঢাকা সদর ঘাট থেকে ১৫ জানুয়ারি রাত ৮টায় এমভি গ্লো্লরি অব শ্রীনগর-৩ লঞ্চে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। সেবার ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, নোয়াখালী জেলার বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার প্রায় ২০টি চরে ৪৯ প্রজাতির প্রায় ৬০ হাজার পরিযায়ী পাখি শুমারি করা হয়েছে। এ ছাড়াও ছোটখাটো অন্যান্য চরেও উড়ন্ত অবস্থায় দেখা গেছে আরও প্রায় ৪০ হাজার পাখি।

বাংলাদেশের পাখি শুমারি বিষয়ে ইনাম আল হক বলেন, বিশ্বব্যাপী পাখি নিয়ে গবেষণা করছে 'ওয়েটল্যান্ডস ইন্টারন্যাশনাল' (ডবি্ল্লউআই) সংস্থা। এই সংস্থার এশিয়া অঞ্চলের সংগঠনের নাম 'এশিয়ান ওয়াটার বার্ড সেনসাস' (এডবি্ল্লউসি)। এই সংস্থা প্রতি বছর শীতকালে এশিয়ার দেশগুলোতে একযোগে জলচর পাখিশুমারি করে থাকে। এই সংস্থার বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয়ক বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব। এই ক্লাবের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে প্রায় ২০ বছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন জলাশয়, হাওর-বাঁওড় ও উপকূলীয় এলাকায় আমরা এই পাখিশুমারি করে আসছি। আমাদের শুমারির এই ফলাফল ওয়েটল্যান্ডস ইন্টারন্যাশনাল আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রকাশানায় তুলে ধরে। 

গাজী মুনছুর আজিজ
মুলসুত্র: http://www.bangladesh-pratidin.com/?view=details&type=gold&data=Mobile&pub_no=246&cat_id=3&menu_id=16&news_type_id=1&index=0