Tuesday, October 19, 2010

নোবেল পুরস্কারের আদ্যোপান্ত


পাহাড় দেখোনি, এমন কাউকে তো খুঁজেই পাওয়া যাবেনা। পাহাড়ের মাঝের সুড়ঙ্গ হয়তো দেখোনি অনেকেই। কিন্তু শুনেছো নিশ্চয়ই, অনেক দেশেই পাহাড়ের মাঝে আছে সুড়ঙ্গ। আর সেই সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে চলে যায় রেলগাড়ি। পাহাড় কেটে সুড়ঙ্গ তৈরি করা কিন্তু এতো সহজ নয়। তবুও মানুষ সে কাজ করে চলেছে খুব সহজে। কীভাবে বলো তো? এর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ডিনামাইট। ডিনামাইট হচ্ছে খুবই শক্তিশালী এক বিস্ফোরক। যেকোনো বড় সড় পাহাড় মুহূর্তে ধ্বংস করার জন্য ডিনামাইটের বিকল্প নেই। এর আবিষ্কারের আগে পাহাড় বা বড়ো পাথর সরিয়ে কাজ করার প্রয়োজন হলেও মানুষ সহজে তা করতে পারতো না। কিন্তু ডিনামাইট আবিষ্কার হওয়ার পর এরকম সব কাজ পানির মতো সহজ হয়ে গেল। কে তবে আবিষ্কার করেন এই ডিনামাইট? তার নাম আলফ্রেড নোবেল। একাধারে রসায়নবিদ,  প্রকৌশলি আলফ্রেড নোবেলের মোট আবিষ্কারের সংখ্যা ৩৫৫, যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত আবিষ্কার ডিনামাইট। এতো বিশাল সংখ্যক আবিষ্কার করে প্রচুর টাকা রোজগার করেন সুইডেনে জন্ম নেওয়া এই বিজ্ঞানী। সেই টাকা দিয়েই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানজনক পুরষ্কার ‘নোবেল পুরষ্কার’।

নোবেল পুরষ্কার প্রতিষ্ঠার পেছনের গল্পটা বেশ মজার। আলফ্রেড নোবেলের অধিকাংশ আবিষ্কারই ছিল আগ্নেয়াস্ত্র। ডিনামাইট বা অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র যেমন মানুষের কল্যানের কাজে ব্যাবহৃত হয়, তেমনি ব্যবহৃত হয় ধ্বংসাত্বক কাজেও। সে কারনে অনেক নিন্দা জোটে আলফ্রেড নোবেলের কপালে। ১৮৮৮ সালে আলফ্রেডের ভাই লুডভিগ ফ্রান্সে ঘুরতে গিয়ে মারা যান। এক ফ্রেঞ্চ পত্রিকা ভুলে ধরে নেয় আলফ্রেড নোবেলই মারা গেছেন। সেই পত্রিকা তখন আলফ্রেডের মৃত্যুর সংবাদ ছাপে। সেখানে তারা আলফ্রেডেকে বর্ণনা করে ‘মৃত্যুর সওদাগর’ বলে। আলফ্রেড মানুষ হত্যার বিভিন্ন অস্ত্র তৈরি করে প্রচুর টাকা উপার্জন করেছেন, কিন্তু সেই টাকা পুরো মানব জাতির কল্যানের কোনো কাজে ব্যয় করেননি বলে তার প্রচন্ড নিন্দা করে। পত্রিকার এই লেখাটি আলফ্রেড নোবেল নিজে পড়েন। পড়া শেষে তিনি বেশ কষ্ট পান। অনেক চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেন তাঁর উপার্জিত অর্থ মানব কল্যানের কাজে ব্যয় করবেন। এরপর ১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসে আলফ্রেড নোবেল তার মোট উপার্জনের ৯৪% (৩ কোটি সুইডিশ ক্রোনার) দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন নোবেল পুরষ্কার।
নোবেল পুরষ্কারের মূল লক্ষ্য মানব কল্যানের জন্য কোনো কাজকে উৎসাহিত করা। সেই উদ্দেশ্যে নোবেল তার রেখে যাওয়া সম্পদ হতে উপার্জিত অর্থ ৫ ভাগ করে পুরষ্কার হিসেবে দান করার কথা বলে যান তার উইলে। এই পাঁচ ভাগ পাবে সমান অংশে পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা শাস্ত্র, সাহিত্য এবং শান্তিতে অসাধারন অবদান রাখা ব্যাক্তি বা ব্যক্তি বর্গ। পরবর্তীতে, ১৯৬৮ সালে সুইডিশ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক রিক্সব্যাঙ্কেন তাদের ৩০০ বছর পূর্তিতে আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতিকে স্মরণ করে অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখা ব্যাক্তিদের জন্যও নতুন একটি পুরষ্কার ঘোষনা করে। এই পুরষ্কারের দায়িত্বও দেওয়া হয় নোবেল ফাউন্ডেশনকে এবং এর বিজয়ী নির্বাচনের ভার থাকে রয়েল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস এর উপর। তখন থেকেই এই পুরষ্কারকে অর্থনীতির নোবেল পুরষ্কারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়; যদিও এই পুরষ্কারের অর্থের যোগান দেয় রিক্সব্যাঙ্কেন।

আলফ্রেড নোবেল উইলে সাক্ষর করেন ১৮৯৫ সালে, কিন্তু পুরষ্কার ঘোষণার সার্বিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর এই উইল বাস্তবায়নের দায়িত্ব অর্পিত হয় রাগনার সোহলমান এবং রুডলফ লিলিযেকুইস্ট নামের দুই ভদ্রলোকের উপর। ১৮৯৭ সালে আইনসভায় নোবেলের উইল পাস হওয়ার পর এই দুই ভদ্রলোক গঠন করেন নোবেল ফাউন্ডেশন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, নোবেল ফাউন্ডেশন থেকে পুরষ্কার দেওয়া হলেও এই ফাউন্ডেশন নোবেল পুরষ্কারের বিজয়ী নির্বাচন করে না। এই ফাউন্ডেশনের মুল কাজ হলো নোবেলের রেখে যাওয়া অর্থের সার্বিক তত্ত্বাবধায়ন করা এবং নোবেল পুরষ্কারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা করা। পুরষ্কার ঘোষনার দায়িত্ব নোবেল ভাগ করে দিয়ে যান তার উইলে। পদার্থ বিজ্ঞান এবং রসায়ন এর পুরষ্কার ঘোষনা করার দায়িত্ব দেন রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সকে। চিকিৎসা শাস্ত্রের পুরষ্কার দেওয়ার দায়িত্ব দেন ক্যারোলিন্সকা ইন্সটিটিউটকে। সুইডিশ একাডেমি কে দায়িত্ব দেন সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী ঘোষনা করার দায়িত্ব। আর শান্তি পুরষ্কার ঘোষনার দায়িত্ব দেন নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটিকে। এখানে আরেকটা মজার ব্যাপার আছে। তা হলো, যে সময় নোবেল পুরষ্কার প্রতিষ্ঠা করা হয় তখন সুইডেন ও নরওয়ে ছিলো একসঙ্গে যা পরবর্তীতে ভেঙ্গে যায়। ফলে নোবেল পুরষ্কার ঘোষনার দায়িত্ব ভাগ হয়ে যায় দুই দেশের মধ্যে।

নোবেল ফাউন্ডেশন গঠনের পর পরই আলফ্রেড নোবেল পুরষ্কার ঘোষণার জন্য যেই প্রতিষ্ঠান গুলো ঠিক করে দিয়ে যান, সেই প্রতিষ্ঠান গুলো গঠন করে নোবেল কমিটি। এই নোবেল কমিটি গুলোই ঘোষণা করে পুরষ্কার। পুরষ্কার ঘোষণার জন্য প্রত্যেক বছর সেপ্টেম্বর মাসে নোবেল কমিটি গুলো মনোনয়ন আহবান করে। সেই মনোনয়ন পরের বছর জানুয়ারীর মধ্যে জমা করতে হয়। অতঃপর সেই মনোনয়ন থেকে সংক্ষিপ্ত তালিকা গঠন করা হয়। সেই তালিকার উপর কমিটির সদস্যদের ভোটাধিকারের মাধ্যমে নির্বাচন করা হয় নোবেল পুরষ্কার। প্রত্যেক বছর নোবেল পুরষ্কার ঘোষণা করা হয় অক্টোবর মাসে। অর্থাৎ এক বছরেও বেশী সময় ধরে চলে এই পুরষ্কারের বিজয়ী নির্বাচন করার প্রক্রিয়া।

১৯০০ সালের নোবেল পুরষ্কার ঘোষণার কিছু নিয়ম নির্ধারন করা হয়। সেই নিয়ম অনুসারে প্রত্যেক নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা, একটি গোল্ড মেডেল এবং একটি সার্টিফিকেট পেয়ে থাকে। এই অর্থের পরিমান নির্ভর করে নোবেল ফাউন্ডেশনের আয় এর উপর। যদি একাধিক ব্যাক্তি একই ক্ষেত্রে পুরষ্কারের জন্য নির্বাচিত হন, তাহলে তাদেরকে এই ভাগ করে দেয়া হয়। শুধু মাত্র শান্তি পুরষ্কারের জন্য কোনো ব্যাক্তির বাইরে কোন প্রতিষ্ঠানকেও নির্বাচন করা যায়। 

এই সব নিয়ম কানুন ঠিক করে প্রথম পুরষ্কার ঘোষণা করা হয় ১৯০১ সালে- আলফ্রেড নোবেলের উইল স্বাক্ষরের ৫ বছর পর। পদার্থ বিজ্ঞানে পুরষ্কার পান জার্মান বিজ্ঞানী রন্টজেণ্ট। এক্স-রে আবিষ্কার করার স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরষ্কার পান তিনি। রসায়নে অনবদ্য অবদান রাখায় জ্যকব হান্ট হফ নোবেল পান সেই বছর। ডিপথেরিয়ার প্রতিষেধক আবিষ্কার করে চিকিৎসায় নোবেল পান এমিল বেরিং। সাহিত্যে নোবেল দেওয়া হয় সুলি ফরুডহোমকে। শান্তিতে যুগ্ম ভাবে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হন ফরাসী নাগরিক ফেডেরিক পুসি এবং রেড ক্রসের প্রতিষ্ঠাতা জীন হেনরী ডুনান্ট। আর এভাবেই পথ চলা শুরু করে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানজনক পুরষ্কার- নোবেল পুরষ্কার।

সৌরভ ওয়াহেদ 
বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/সৌরভ/এসএ/সাগর/অক্টোবর ১৪/১০
মুল লেখা পড়ুন:
http://kidz.bdnews24.com/bishesh_rochona.php?bisheshrochonaid=125

পাহাড়ের বুকে স্বপ্নের গাঁ


পলাশ বড়ুয়া, দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি) | তারিখ: ১৫-১০-২০১০
সংঘাত, মারামারি, হানাহানি নেই সেখানে। মানুষগুলো একদম সাদাসিধে। সবাই একজোট হয়ে কাজ করেন। সে কাজও বেশ গোছালো। কেউ কাজে ফাঁকি দেন না। গাঁয়ের জন্য, নিজেদের জন্য নিরন্তর শ্রম দেন। ওঁদের আছে একটি সমিতি। পাহাড়ের বুকে ছোট্ট সেই গাঁয়ের মানুষগুলো সমিতির বেঁধে দেওয়া নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন। তাই তিন বছরের মাথায় দারিদ্র্যের চেনা রূপ বিদায় নিয়েছে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বৈদ্যপাড়া গ্রাম থেকে।
বছর তিনেক আগেও অভাব ছিল গাঁয়ের ৯০টি পরিবারের নিত্যসঙ্গী। অশিক্ষা, ঝাড়ফুঁক, তুকতাকই যেন ছিল আদিবাসী মানুষগুলোর নিয়তি। দিন পাল্টেছে। প্রতিটি পরিবার এখন স্বাবলম্বী। গ্রামের শিশুরা সবাই দলবেঁধে স্কুলে যায়। নারী-পুরুষ দলে দলে ভাগ হয়ে মাছ চাষ করে, কেউ করে বাগান। সমঝদার নারীরা ঘরে ঘরে গিয়ে শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষার তদারক করেন। মেয়েদের বাল্যবিয়ে দিতে করেন মানা। গাঁয়ের লোকদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে কয়েকজন তরুণ নিচ্ছেন পল্লি চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ। এসবই সম্ভব হয়েছে একটি সমবায় সমিতির জন্য। আমাদের চেনা আর দশটা সমিতি থেকে যা একেবারেই ভিন্ন।
২০০৭ সালের শুরুর দিকে গাঁয়ের সবাই মিলে একটিমাত্র সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যে সিদ্ধান্ত গোটা গ্রামের মানুষের চালচিত্র পাল্টে দেয়। তাঁরা একজোট হয়ে সে দিন একটি সমিতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ওই বছরের ১ জুন গঠন করেছিলেন বৈদ্যপাড়া মৎস্য সমবায় সমিতি। সেই সমিতি একটু একটু করে ডালপালা মেলেছে। এককালের পশ্চাৎপদ গ্রামটিকে দেখিয়েছে উন্নতির পথ।
প্রতি মাসে সমিতির বৈঠক হয়। সবার কথা ও পরামর্শ সমান গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হয়। এখানে নারী-পুরুষে নেই কোনো ভেদাভেদ। সমিতি গঠনের পর তহবিলের জন্য প্রতি পরিবার মাসে ১০ টাকা জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ক্ষুদ্র সেই সঞ্চয় আজ কয়েক লাখ টাকায় পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি ওই গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, লোকজন দলবদ্ধ হয়ে ১২ একরের একটি পুকুরে আবর্জনা পরিষ্কার করছেন। কয়েকজন হ্রদের বিভিন্ন স্থানে মাছের খাদ্য দিচ্ছেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে এগিয়ে আসেন বৈদ্যপাড়া মৎস্য সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাহুল চন্দ্র চাকমা। নিয়ে যান সমিতির কার্যালয়ে। রাহুল চন্দ্র চাকমা বলেন, ‘সমিতি গঠনের আগে গ্রামের কথা ভাবলে এখনো মনে হয় আমরা কত পিছিয়ে ছিলাম। আমাদের ১০ টাকার মাসিক সঞ্চয় ক্ষুদ্র হলেও আজ তা বড় আকার ধারণ করেছে।’
সমিতির সভাপতি সুমতি চাকমা বলেন, ‘আমাদের যে টাকা জমে ছিল, সেখানে মাত্র ৫০০ টাকা রেখে বাকি টাকা তুলে আমরা গ্রামের অনাবাদি জমিতে বাঁধ দিয়ে মৎস্য খামার গড়ে তুলি। রাত-দিন নারী-পুরুষ মিলে মাটি কেটে বাঁধ তৈরি করে ফেলি। সমিতির আওতায় রয়েছে ৩০ হাজার চারার একটি ফলদ বাগান।’
সমিতিতে নারীদের নিয়ে আছে একটি দল। নারী দলের দলনেত্রী কুয়াশা চাকমা, সাধারণ সম্পাদক দেশনা চাকমা। নারীরা পুকুরের পাড়ে গড়ে তুলছেন শাকসবজির বাগান। নারীদের নিয়ে আরেকটি রয়েছে মা দল। এ দলের সদস্যরা ঘরে ঘরে গিয়ে নারী ও শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতামূলক কথা বলেন। জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে অন্য নারীদের ধারণা দেন। শিশুদের সময়মতো টিকা দেওয়া হয়েছে কি না, খোঁজ নেন।
কুয়াশা চাকমা বলেন, ‘এ সমিমিতে নারী-পুরুষ সবাই সমান। সবাই সমান পরিশ্রম করে। তবে সবাইকে কাজ ভাগ করে দেওয়া আছে। এটা শুধু একটা সমিতি নয়। আমাদের স্বপ্ন, সমিতির সব সদস্যকে একটি পরিবারে রূপান্তরিত করা। আমরা সবাই সবার সুখে সুখী, সবার দুঃখে দুঃখী।’ তিনি আরও জানান, পরিবারগুলোকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে কয়েকজন তরুণকে পল্লি চিকিৎসায় প্রশিক্ষণ নিতে পাঠানো হয়েছে। পুকুরে মাছের খাবার দেওয়ার জন্য রয়েছে একটি যুব কমিটি। এই কমিটির কাজ হচ্ছে শুধু মাছের খাদ্য দেওয়া এবং গ্রামের পরিবারগুলোর কাছ থেকে মাসে ১০০ টাকা হারে চাঁদা তুলে মাছের খাবার কিনে আনা।
রাহুল চাকমা বলেন, ‘আমাদের প্রধান লক্ষ্য, গ্রামের সব পরিবারকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা। গ্রামের প্রতিটি পরিবারের জন্য শিশুকে স্কুলে পাঠানো বাধ্যতামূলক। প্রতিদিন আমরা খোঁজ নিই, কোনো শিশু স্কুল কামাই করছে কি না। গ্রামবাসীকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন করতে ২০১১ সালে একটি ‘রাইস-ব্যাংক’ চালু করার ইচ্ছা পোষণ করেন রাহুল চাকমা। গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থীদের সমিতি থেকে উপবৃত্তি দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন তাঁরা। সমিতির মূলমন্ত্র হচ্ছে, মাসিক সভায় সব সদস্যের কথা বলার অধিকার ও তাঁদের পরামর্শ নেওয়া। তাঁদের সমিতিটি সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধনভুক্ত, জানালেন রাহুল চাকমা।
এমন একটি সমবায় সমিতির কথা শুনে ৩ অক্টোবর বৈদ্যপাড়া গিয়েছিলেন দীঘিনালার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান মিঞা। সঙ্গে ছিলেন উপজেলা পরিষদের নারী ভাইস চেয়ারম্যান শতরুপা চাকমা, মৎস্য কর্মকর্তা অবর্ণা চাকমা ও দীঘিনালা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান চন্দ্র রঞ্জন চাকমা। সমিতির কার্যক্রম দেখে ইউএনও বলেন, ‘একটি পশ্চাৎপদ গ্রামে এ ধরনের সমিতি সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমি নিজে ঘুরে না দেখলে গল্প বলে ভাবতাম। এখন দেখছি সত্যি এটি একটি সোনার গ্রাম।’
ইউপি চেয়ারম্যান চন্দ্র রঞ্জন চাকমা বলেন, ‘গ্রামে যত রাস্তা সবই গ্রামবাসীর করা। আমার ইউনিয়নের মধ্যে এ ধরনের একটি গ্রাম আছে, সেটাই আমার বড় অহংকার।’

পাখিরা বাতাসের উল্টা দিকে ওড়ে কেন?

আব্দুল কাইয়ুম | তারিখ: ১৬-১০-২০১০


আমরা যদি মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখব, সাধারণত বাতাস যেদিকে বয়ে যায়, পাখিরা তার উল্টা দিকে উড়তে ভালোবাসে। কালবৈশাখীর সময় কাক, চড়ুই বা শালিক পাখির ওড়ার ধরন লক্ষ করলেই ব্যাপারটা ধরা পড়বে। অথচ সাধারণ বিচারে মনে হয়, বায়ুপ্রবাহের দিকে ওড়াই তো উচিত, কষ্ট কম হবে, বাতাসের জোরে সহজে ওড়া যাবে। কিন্তু বাস্তব ঘটনা হলো, বায়ুপ্রবাহের দিকে ওড়া বরং কঠিন ও কষ্টকর। এটা উড়োজাহাজের (অ্যারোপ্লেন) বেলায়ও সত্য। পাখি বা উড়োজাহাজের উড়তে হলে নিচ থেকে ওপরের দিকে একটা বল প্রয়োগের (লিফট) প্রয়োজন হয়। এই ঊর্ধ্বমুখী বল সৃষ্টি করার জন্য পাখি বা উড়োজাহাজকে তার ডানা এমনভাবে স্থাপন করতে হয় যেন ওপরের দিকে বায়ুর চাপ কম এবং নিচের দিকে বেশি হয়। চাপের এই পার্থক্যই তাকে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়। তাদের প্রধান কাজ হলো ওড়ার সময় ডানার ওপরের বাতাসকে ধাক্কা দিয়ে আরও ওপরে সরিয়ে দেওয়া, যেন ডানার ঠিক ওপরের অংশে বাতাসের ঘনত্ব কমে চাপ কমে যায়। উড়োজাহাজ ওড়ার সময় এর ডানার সামনের অংশ কিছুটা ওপরে তুলে দিয়ে এই কাজটি করে। পাখিও ওড়ার সময় একইভাবে তার ডানার ওপরের অংশ ফুলিয়ে বাতাসকে ওপরে ঠেলে দেয়। বাতাসের বিপরীতে ওড়ার সুবিধা হলো, ওই অবস্থায় বাতাস সামনের দিক থেকে পেছনের দিকে জোরে প্রবাহিত হয়। এতে ডানার ওপরে ও নিচে বাতাসের চাপের পার্থক্য বেশি হয় এবং তাই সহজে ওড়া যায়। সে জন্যই বৈমানিকেরাও বায়ুপ্রবাহের উল্টা দিকে উড়তে পছন্দ করেন। পাখির পালক এমনভাবে সাজানো থাকে, যেন বাতাস সহজে তার ওপর দিয়ে বয়ে যেতে পারে। পাখিরা যদি বাতাসের উল্টা দিকে উড়তে চায়, তাহলে বাতাস পেছন দিক থেকে সামনে যাবে, তাতে তার ডানার পালক ওলটপালট হয়ে সমস্যা দেখা দেবে। আর তা ছাড়া ডানার ওপরে ও নিচে বাতাসের চাপের পার্থক্য সৃষ্টি করাও কঠিন হবে।

জলে-জঙ্গলে


সংগ্রহ: দৈনিক প্রথম আলো | তারিখ: ১৬-১০-২০১০

পানিকাটা পাখি পানিকাটা পাখি
আলোকচিত্র: রেজা খান

বিচিত্র আর বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর খোঁজে তিনি চষে বেড়ান দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। সম্প্রতি বেরিয়েছে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও প্রাণীজগৎ নিয়ে লেখা তাঁর বই ‘ওয়াইল্ড লাইফ অব বাংলাদেশ’। বন্য প্রাণী-বিশারদ ও গবেষক রেজা খান এবারের মূল রচনায় শুনিয়েছেন বিরল প্রাণের খোঁজে তাঁর কিছু রোমাঞ্চকর অভিযানের গল্প।

কাঁকড়াভুক
জুলাই মাসে বৃষ্টিবাদল মাথায় করে শখে কেউ সুন্দরবনে যায় না। কিন্তু গত বছর কয়েকজন শখের বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, সংস্কৃতিবিদ ও ছবিধারকের এক জগাখিচুড়ি দলে যোগ দিয়ে সুন্দরবনে যাই মধ্য মাসে। মুহুর্মুহু বৃষ্টি, মেঘে ভরা আকাশ আর ঝোড়ো বাতাস ছিল আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। নলিয়ান রেঞ্জের কাছে পৌঁছাতে অনির্ধারিতভাবে জাহাজ নোঙর করল। মাস্টার জানালেন, ইঞ্জিনচালিত জলযানটি বিকল হয়েছে। এটি সারাতে ঘণ্টা খানেক সময় নেবে। সুযোগ বুঝে বিকল নৌকায় উঠে পড়লাম। মাঝিরা দাঁড়ের সাহায্যে পাড়ে নাও ভেড়াল। তাঁরা যন্ত্র সারাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লে আমি নেমে পড়লাম নদীর পাড় ধরে মাটির তৈরি বেড়িবাঁধের ওপর।
প্রথমে খুঁজে বের করলাম বন বিভাগীয় অফিস। দেখলাম, সিডরের আঘাতে বিশাল বিশাল পুকুরে ঢুকে পড়েছে নদীর লোনা ও পচা পানি। খাওয়ার পানির তীব্র অভাব। মানুষসহ গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি আশ্রয় নিয়েছে বেড়িবাঁধে।
হাঁটতে শুরু করলাম বাঁধ ধরে। দৃষ্টি নদীর পাড়ে। আশা চিংড়ি বা কাঁকড়ার বাহারি প্রজাতির ছবি তোলা। ঝোড়ো হাওয়ার ফলে বেশির ভাগ মাছধরা নৌকা পাড়ে ভিড়ে আছে। হঠাৎ চোখে পড়ল এত সব ভিড়ভাট্টার মধ্যেও কাদার রঙে রং, অনেকটা কোলাব্যাঙ-সদৃশ একটি কাদায় মাখানো ব্যাঙ ঘাপটি মেরে বসে আছে বাঁধের নদীর দিকে মুখ করা পাড়ের শক্ত মাটিতে।
ব্যাপারটি অবাক করার মতো। কারণ, কুনোব্যাঙ ছাড়া বাকি সব ব্যাঙ মানুষ কাছে গেলেই পানিতে পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। আর ব্যাঙটি কিনা জলকেলি করা বালক ও বাঁধের ওপর দিয়ে চলাচলকারী অনেক লোকের মধ্যেও চুপটি করে বসে আছে!
ওখান থেকে আরেকটু দূরে পানির ওপর মাচা করে বানানো একটি ছোট গোলাঘরের নিচের মাটির মেঝেতে, নদীমুখী পাড়ের দিকে দেখি আরও একটি এমন ব্যাঙ। এটির গায়ে কাদা কম ছিল, কিন্তু সে-ও প্রায় ভয়শূন্যভাবে অনড় বসেছিল আমার কয়েক ডজন ছবি তোলা পর্যন্ত।
দুটি ব্যাঙই ছিল সচরাচর দেখা সব ব্যাঙ থেকে আলাদা। ঢাকায় ফিরে প্রথমে দেশে ছাপানো সব বই ঘাঁটলাম। তারপর চাপলাম ইন্টারনেটের ওপর। একসময় পেয়ে গেলাম ক্রাব-ইটিং ফ্রগ নামের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ম্যানগ্রোভ বনে বাস করা একটি ব্যাঙের নাম, পরিচয় ও ছবি। এরপর পেলাম ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের ব্যাঙবিষয়ক এক গবেষকের লেখা গবেষণাপত্র, যাতে তিনি বলেছেন, উড়িষ্যাতে তিনি এ ব্যাঙের প্রথম নমুনা পান বছর খানেক আগে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনিরুল হক খান তাঁর বইটিতে (২০০৮ সালে প্রকাশিত) সুন্দরবন থেকে আমার তোলা ছবিসদৃশ নাম ও প্রজাতি চিহ্নিতকরণ ছাড়া অন্য একটি ব্যাঙের ছবি ছাপেন। ইন্টারনেটে আরও দেখি, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন বিজ্ঞানী বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ দিকে এশীয় অঞ্চলের কিছু ঝিঁঝি ও ক্রাব-ইটিং ফ্রগের ওপর জেনেটিক বা ডিএনএ স্যাম্পলিং করেন।
অতএব, ক্রাব-ইটিং বা ম্যানগ্রোভ ফ্রগটি বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত কোনো বইয়ে তখনো ঠাঁই পায়নি। এটি আমাদের দেশের বন্য প্রাণীর নামের তালিকায় সংযোজিত একটি নতুন প্রজাতি, যার বাংলা নাম আমি রাখি কাঁকড়াভুক ব্যাঙ। কারণ, এরা ব্যাপকভাবে কাঁকড়া খায় এবং লোনা পানিতে বসবাসের উপযুক্ততা রাখে। আমার লেখা ওয়াইল্ড লাইফ অব বাংলাদেশ বইতে এর বাংলা, ইংরেজি ও লাতিন নাম এবং ছবি প্রথমবারের মতো সংযুক্তি পায়।

পানিকাটা পাখির দল
সম্ভবত ১৯৯৫ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। পরিযায়ী পাখি শুমারের জন্য একটি ছোট মাছ ধরার ট্রলার ভাড়া করে নোয়াখালীর দক্ষিণের হাতিয়া যাওয়ার লঞ্চঘাট থেকে যাত্রা শুরু করি নিঝুম দ্বীপের উদ্দেশে। সঙ্গে অনুজ আনিস, প্রাক্তন ছাত্র ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফরীদ আহসান ও উইং কমান্ডার (অবসরপ্রাপ্ত) ইনাম আল হক। ইনাম ভাই তখন ছিলেন শাকাহারি আর তাই সঙ্গে নিয়েছিলেন অনেক আলু, শসা, কলা এবং বিভিন্ন ধরনের কিছু সবজি ও ফল। ওই সময় জানুয়ারির ভরা শীতেও যার যার গায়ে যে গরম কাপড় ছিল, তা পরেই ঘুমাতাম কাঠের পাটাতন করে ইঞ্জিনের চারপাশ ঘিরে বানানো তাকের ওপর। বালিশের কাজ চালিয়েছি ক্যামেরা বা দুরবিনের ব্যাগ দিয়ে।
তিন দিন ধরে পাখি দেখার কাজ শেষ করে যখন ফিরছিলাম, তখনকার হাতিয়া দ্বীপ ছিল আমাদের ডান হাতে এবং বাঁয়ে অনেক দূরে ঢালচর ও মৌলভীর চর। হাতিয়ার উত্তর-পশ্চিম কোণে তখন যে ছোট দ্বীপমতো অংশ ছিল, যার নাম কচ্ছপিয়া দ্বীপ, তা এখন নদীগর্ভে। ওখানে রাখাল বালকেরা গরু-মোষ চড়াচ্ছিল। এদের পালের ফাঁক থেকে প্রায় হঠাৎই গাঙচিলসদৃশ্য একঝাঁক পাখি উড়াল দিল। এরপর তারা এসে বসল চরের কিনারে। সে সময় স্থিরচিত্র ধারণের জন্য যে ফিল্ম ও ক্যামেরা ছিল, তার ৩০০ মিলিমিটার লেন্সের সাহায্যে যে ছবি তুললাম, তা দিয়ে কেবল প্রমাণিত হলো, পাখির দলটি ছিল পানিকাটা পাখির প্রজাতির বা ইন্ডিয়ান স্কিমারের। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সম্ভবত আমরাই এদের দলকে প্রথম দেখি দেশের চৌহদ্দির মধ্যে। কিন্তু সে ছবি বইয়ে ছাপার মতো মানের ছিল না।
এ বছর জানুয়ারি মাসে তাই ছুটেছিলাম হাতিয়ার উদ্দেশে। ১৯৯৪ এবং এখনকার হাতিয়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। মনে হয় পুরো হচ্ছপিয়া দ্বীপ হাতিয়া থেকে ভেঙে এসে নোয়াখালীর দক্ষিণে যোগ হয়ে মূল ভূখণ্ডকে চার-পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণে বাড়িয়ে নিয়ে গেছে। প্রমাদ গুনলাম এই বলে যে, পানিকাটা পাখিদের সম্ভবত আর দেখা যাবে না।
কিন্তু দ্বীপের জাহাজমারা এলাকায় পৌঁছার পর জানলাম, মুখতারিয়া খাল বা মুখতারিয়াচরে গাঙচিলের একটি বড় দল বাস করে। তবে সমস্যা হলো ওই এলাকায় একটি ডাকাতদল বিচরণ করছে, যাদের সঙ্গে এক পক্ষকাল আগে বন বিভাগ ও পুলিশের সম্মিলিত লোকবলের বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। তাদের কয়েকজন ডাকাত ধরাও পড়েছে। কাজেই আমাকে সবাই সতর্ক করে দিল।
অবস্থা বেগতিক বুঝে বাজারে ঢুকে স্থানীয় লোকজনের পোশাকের মতো লুঙ্গি, গেঞ্জি, শার্ট, চাদর পরে নিলাম। পায়ে চাপালাম বুটের জায়গায় প্লাস্টিকের স্যান্ডেল।
কপাল ভালো, বন বিভাগ তাদের পরিচিত একটি নৌকা ভাড়া করে দেয়। সে নৌকায় বসে কনকনে উত্তরের হিমেল হাওয়া ও ঘন কুয়াশা মাথায় করে ঠোঁট কাঁপাতে কাঁপাতে যখন মুখতারিয়া খালে, মানে বেশ প্রশস্ত নদীতে ঢুকলাম, তখন একটু চাপা ভয় ছিল—কখন না ডাকাতের দল বলে, ‘এই, নাও থামাও।’
সম্ভবত কুয়াশাঘেরা এবং হাড়কাঁপানো শীতের কারণে অত ভোরে কোনো জেলে বা অন্য কোনো লোক নদীতে ছিল না। আমাদের কপাল খুব ভালো ছিল, কারণ, প্রথম আধা কিলোমিটার যাওয়ার পরই দেখি, একঝাঁক পাখি আমাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। এর পরই দেখি ৪০০-৫০০ গাঙচিলের মতো পাখি দক্ষিণের মোহনাঞ্চল থেকে আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। ডিজিটাল ক্যামেরা তাক করে শতাধিক ছবি তুলে তা যখন ক্যামেরার মিনি এলসিডি পর্দায় দেখলাম, তখন আমার আনন্দ যেন আর ধরে না। ওরা সবাই ছিল পানিকাটা পাখি।
এরপর দেখলাম, পুরো দলটি গিয়ে নামল ২০০-৩০০ মিটার দূরের সামান্য পানিময় কাদা বেলায়। পরের ১৫ মিনিটের মধ্যে আরও একটি দল এল আগে নামা দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য। সূর্যহীন আকাশের সাহায্যে বেশ কিছু ছবি তুললাম এবং মাঝিকে বললাম, ফিরে চলো। ওই ছবিরই একটি ব্যবহূত হয়েছে আমার এবারের ওয়াইল্ড লাইফ অব বাংলাদেশ বইয়ে।

‘দড়াবাজিকর’ উল্লুক
আশির দশকে বই লেখার সময় বাংলাদেশে যে উল্লুকের প্রজাতি পাওয়া যায়, তার বাংলা নাম দিই ‘দড়াবাজিকর’ উল্লুক। কারণ, বনবাদাড়ে এর মতো সার্কাস দেখানোর যোগ্য আমাদের দেশে দ্বিতীয় আর কোনো বন্য প্রাণী নেই। কিন্তু বনের চাঁদোয়ায়, মানে ক্যানোপিতে ঘুরে বেড়ানো এবং অতীব চঞ্চলমতি এ উল্লুকের নাগাল ক্যামেরার লেন্সে পাওয়া বেশ দুঃসাধ্য। যাঁরা খুব ধৈর্য ধরে বনে বনে দিন কাটিয়েছেন, তাঁদের পক্ষে এদের ক্যামেরাবন্দী করা তেমন কঠিন কাজ হয়নি। কিন্তু আমার মতো যারা স্বল্প সময়ের জন্য বনে ঢুকে সব ধরনের বন্য প্রাণী দেখা ও ছবি তোলার প্রচেষ্টা নেয়, তাদের পক্ষে উল্লুকের ছবি তোলা কঠিন বৈকি।
মজার ব্যাপার হলো, যুবক উল্লুক এবং সোমত্ত পুরুষের রং সব সময় কালো হয় এবং ভ্রু থাকে সাদা। স্ত্রী উল্লুকের সচরাচর থাকে সাদা ভ্রু বাদে ফিকে শিয়ালে-বাদামি। এরা যখন বনের লতাপাতার মধ্যে চুপটি করে বসে থাকে, তখন তাদের চোখ দুটি ক্যামেরায় ধরা প্রায় অসম্ভব।
সেবার শ্রীমঙ্গলের পাশের জাতীয় উদ্যান লাউয়াছড়ায় যখন পৌঁছালাম, তখন বেলা বেশি হয়নি। উল্লুক ভোরবেলা মুহুর্মুহু গগনবিদারি এবং ছন্দময় ডাক হাঁকিয়ে দুলতে দুলতে গাছের এক মগডাল থেকে অন্য ডালে যায়, তখন মনে হবে বনের ভেতর হাজারটা প্রাণী তারস্বরে চিৎকার করছে। এ শব্দ আরও বিকট হয় যেহেতু পুরুষ-স্ত্রী মিলে ‘দ্বৈত সংগীত’-এর মতো শব্দ করে প্রজাতি আপেক্ষিক ডাক ছাড়ে বা গান গায়, যা বনের গাছপালার মোটা মোটা কাণ্ডের সঙ্গে বাড়ি খেয়ে শব্দের চেয়ে প্রতিশব্দের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত করে। নতুন যেকোনো মানুষের কাছে এ শব্দ ভীতিপ্রদ ঠেকতে পারে।
বনের কাছে পৌঁছাতেই এদের হুহা-হুহা-হুহা-হুহা শব্দ কানে তালা লাগিয়ে দিল। কিন্তু বনের কোথাও এদের টিকিটি পর্যন্ত দেখতে পেলাম না।
সিরাজুল হোসেন মনে হয় দেশে সবচেয়ে ভালো ছবি তুলেছেন উল্লুকের। তিনি তখন পাশের জঙ্গলে গাইড শ্যামলকে নিয়ে ছবি তোলায় ব্যস্ত ছিলেন এবং ধরে নিয়েছিলেন আমার পক্ষে উল্লুকের দেখা পাওয়া সহজ হবে না। আর তাই তিনি শ্যামলকে পাঠান আমাকে খুঁজে বের করে তাঁর কাছে নিয়ে যেতে।
শ্যামলের সঙ্গে অতি সন্তর্পণে পাহাড়ের খাড়া গা বেয়ে ওপরে উঠে প্রায় এক কিলোমিটার চলার পর শ্যামল চাপালিশ গাছের চাঁদোয়ার দিকে তাক করে বলল, দেখুন, দলপতি পুরুষটি কেমন করে গাছের কাণ্ডের সঙ্গে নিজের দেহটাকে খাপ খাইয়ে বসে আমাদেরই যেন দেখছে। একটু দূরে বড় বড় ক্যামেরা ট্রাইপডে বসিয়ে উল্লুকের দিকে তাক করে আছেন সিরাজুল হোসেন।
প্রায় দৈবাতই পুরুষটি একটি ভূ-সমান্তরাল ডালে এসে দোল খেল আর আমি সুযোগ পেয়ে ডিজিটাল ক্যামেরার ৩০০ মিমি ফিক্সড লেন্সের ভেতর দিয়ে দেখে কয়েক ডজন ছবি তুললাম এবং মনে মনে দারুণ খুশি হলাম। ধন্যবাদ শ্যামল ও সিরাজ ভাইকে।

এক টুকরো জীবন
রেজা খানের জন্ম ঢাকার ধামরাইয়ে। সময়টা জানুয়ারি ১৯৪৭। স্কুল আর কলেজ-জীবনের লেখাপড়া মানিকগঞ্জে। ঢাকার নটর ডেম কলেজ থেকে বিএসসি। এমএসসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ থেকে। পরে বম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি। প্রভাষক হিসেবে ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার আগে বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন নটর ডেম কলেজ ও আইডিয়াল কলেজে। ১৯৮৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-আইন চিড়িয়াখানার কিউরেটর হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৯ সাল থেকে টানা ২০ বছর পালন করছেন দুবাই চিড়িয়াখানার প্রধানের দায়িত্ব। এখন দায়িত্বরত আছেন দুবাই সরকারের বন্য প্রাণী ও চিড়িয়াখানা বিশেষজ্ঞ হিসেবে।
জীবজগৎ ও প্রাণিবৈচিত্র্য নিয়ে সুদীর্ঘ চার দশকের গবেষণার ফসল হিসেবে বেরিয়েছে তাঁর ১৬টি বই। এর মধ্যে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা সাত। এ ছাড়া দেশ-বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক বেশ কিছু গবেষণামূলক রচনা।
১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বই ওয়াইল্ড লাইফ অব বাংলাদেশ। ১৭২ পৃষ্ঠার এই বই বাংলাদেশে জীবজগৎ নিয়ে গবেষণায় নতুন দিগন্তের সূচনা করে। সম্প্রতি বেরিয়েছে বইটির পরিবর্তিত ও খুদে সংস্করণ।

পটকা ব্যাঙের প্রথম ছবি
সেটা সম্ভবত ১৯৮০ বা ৮১ সালের জুন মাস। অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছিল কয়েক দিন ধরে। এ সময় ঢাকায় এল ভারতীয় সর্পম্যান হিসেবে খ্যাত বন্ধুবর রমুলাস হুইটেকার। সে এসেছিল এফএওর অর্থানুকূল্যে বাংলাদেশের গুইসাপের ওপর একটি ত্বরিত সমীক্ষা চালানোর জন্য। সঙ্গে নিল আমাকে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘোরার পর যখন মধুপুর শালবনে পৌঁছালাম, তখন বৃষ্টি যেন তুঙ্গে উঠেছে।
টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের সঙ্গে যোগাযোগকারী বন রেঞ্জ অফিস থেকে তাঁদের রেস্ট হাউস এলাকা রসুলপুরের সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী সড়কটি তলিয়ে গেছে।
এফএওর গাড়িচালক বলল, সে ওই রাস্তা দিয়ে রসুলপুর যেতে পারবে। মোটামুটি হাঁটুপানি ছিল রাস্তার ওপর। মাঝপথে পৌঁছার পর জিপগাড়ি ও তার পানি মাড়ানোর শব্দ ছাপিয়ে কোনো একটা প্রাণীর ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম। আওয়াজটা বেশ জোরেশোরেই চলছিল। রাস্তার পাশে বেশ কিছুটা ডুবো জায়গা ফাঁকা ছিল। সেখানে পানির পরিমাণও বেশি মনে হলো। মনে হচ্ছিল, প্রাণীটা পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। ঔৎসুক্যের বশে ফুলপ্যান্ট না গুটিয়েই পানিতে নেমে পড়লাম। কাছে গিয়ে দেখলাম, এক জোড়া অচেনা-অজানা ব্যাঙ।
ব্যাঙ দুটিকে জোড়বাঁধা অবস্থায় রাস্তার ওপর নিয়ে এসে শুকনো মাটির অভাবে নিজেরই এক হাতের তালুর ওপর রেখে চটপট কয়েকটি রঙিন ছবি তুললাম। কারণ, আমার মনে হয়েছিল, এটি কোনো নতুন ধরনের প্রজাতি, যা দেশে এর আগে দেখিনি বা অন্য কেউ রেকর্ড করেনি।
রমুলাস ব্যাঙটি দেখেই বলল, বেলুন ফ্রগ। ব্যাঙ দুটিকে ফের যেখান থেকে তুলে এনেছিলাম, সেখানে ছেড়ে দিয়ে আমরা আমাদের বাকি কাজে ব্যস্ত হলাম।
ঢাকায় ফিরে ছবির দোকান থেকে স্লাইড ওয়াশ করি। প্রজেক্টারের সাহায্যে দেয়ালে ছবি ফেলি আর বইয়ের সহায়তায় এর প্রজাতি চিহ্নিতকরণের কাজ করি। আমি প্রজাতিটির বাংলা নাম দিই পটকা ব্যাঙ। কারণ, এটাকে হাতে ধরার সঙ্গে সঙ্গে পেটের ভেতর বাতাস ঢুকিয়ে সে পটকা মাছের মতো ফুলে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ১৯৮২ সালে প্রকাশিত আমার লেখা বাংলাদেশের বন্য প্রাণী বইয়ের তালিকায় এ প্রজাতি বাংলাদেশে পাওয়া যাওয়ার প্রথম তথ্য দিই এবং একটি সাদা-কালো ছবি ব্যবহার করি। এবারের বইয়ে আছে এই ব্যাঙের রঙিন ছবি।