Tuesday, October 19, 2010

পাহাড়ের বুকে স্বপ্নের গাঁ


পলাশ বড়ুয়া, দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি) | তারিখ: ১৫-১০-২০১০
সংঘাত, মারামারি, হানাহানি নেই সেখানে। মানুষগুলো একদম সাদাসিধে। সবাই একজোট হয়ে কাজ করেন। সে কাজও বেশ গোছালো। কেউ কাজে ফাঁকি দেন না। গাঁয়ের জন্য, নিজেদের জন্য নিরন্তর শ্রম দেন। ওঁদের আছে একটি সমিতি। পাহাড়ের বুকে ছোট্ট সেই গাঁয়ের মানুষগুলো সমিতির বেঁধে দেওয়া নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন। তাই তিন বছরের মাথায় দারিদ্র্যের চেনা রূপ বিদায় নিয়েছে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বৈদ্যপাড়া গ্রাম থেকে।
বছর তিনেক আগেও অভাব ছিল গাঁয়ের ৯০টি পরিবারের নিত্যসঙ্গী। অশিক্ষা, ঝাড়ফুঁক, তুকতাকই যেন ছিল আদিবাসী মানুষগুলোর নিয়তি। দিন পাল্টেছে। প্রতিটি পরিবার এখন স্বাবলম্বী। গ্রামের শিশুরা সবাই দলবেঁধে স্কুলে যায়। নারী-পুরুষ দলে দলে ভাগ হয়ে মাছ চাষ করে, কেউ করে বাগান। সমঝদার নারীরা ঘরে ঘরে গিয়ে শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষার তদারক করেন। মেয়েদের বাল্যবিয়ে দিতে করেন মানা। গাঁয়ের লোকদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে কয়েকজন তরুণ নিচ্ছেন পল্লি চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ। এসবই সম্ভব হয়েছে একটি সমবায় সমিতির জন্য। আমাদের চেনা আর দশটা সমিতি থেকে যা একেবারেই ভিন্ন।
২০০৭ সালের শুরুর দিকে গাঁয়ের সবাই মিলে একটিমাত্র সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যে সিদ্ধান্ত গোটা গ্রামের মানুষের চালচিত্র পাল্টে দেয়। তাঁরা একজোট হয়ে সে দিন একটি সমিতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ওই বছরের ১ জুন গঠন করেছিলেন বৈদ্যপাড়া মৎস্য সমবায় সমিতি। সেই সমিতি একটু একটু করে ডালপালা মেলেছে। এককালের পশ্চাৎপদ গ্রামটিকে দেখিয়েছে উন্নতির পথ।
প্রতি মাসে সমিতির বৈঠক হয়। সবার কথা ও পরামর্শ সমান গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হয়। এখানে নারী-পুরুষে নেই কোনো ভেদাভেদ। সমিতি গঠনের পর তহবিলের জন্য প্রতি পরিবার মাসে ১০ টাকা জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ক্ষুদ্র সেই সঞ্চয় আজ কয়েক লাখ টাকায় পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি ওই গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, লোকজন দলবদ্ধ হয়ে ১২ একরের একটি পুকুরে আবর্জনা পরিষ্কার করছেন। কয়েকজন হ্রদের বিভিন্ন স্থানে মাছের খাদ্য দিচ্ছেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে এগিয়ে আসেন বৈদ্যপাড়া মৎস্য সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাহুল চন্দ্র চাকমা। নিয়ে যান সমিতির কার্যালয়ে। রাহুল চন্দ্র চাকমা বলেন, ‘সমিতি গঠনের আগে গ্রামের কথা ভাবলে এখনো মনে হয় আমরা কত পিছিয়ে ছিলাম। আমাদের ১০ টাকার মাসিক সঞ্চয় ক্ষুদ্র হলেও আজ তা বড় আকার ধারণ করেছে।’
সমিতির সভাপতি সুমতি চাকমা বলেন, ‘আমাদের যে টাকা জমে ছিল, সেখানে মাত্র ৫০০ টাকা রেখে বাকি টাকা তুলে আমরা গ্রামের অনাবাদি জমিতে বাঁধ দিয়ে মৎস্য খামার গড়ে তুলি। রাত-দিন নারী-পুরুষ মিলে মাটি কেটে বাঁধ তৈরি করে ফেলি। সমিতির আওতায় রয়েছে ৩০ হাজার চারার একটি ফলদ বাগান।’
সমিতিতে নারীদের নিয়ে আছে একটি দল। নারী দলের দলনেত্রী কুয়াশা চাকমা, সাধারণ সম্পাদক দেশনা চাকমা। নারীরা পুকুরের পাড়ে গড়ে তুলছেন শাকসবজির বাগান। নারীদের নিয়ে আরেকটি রয়েছে মা দল। এ দলের সদস্যরা ঘরে ঘরে গিয়ে নারী ও শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতামূলক কথা বলেন। জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে অন্য নারীদের ধারণা দেন। শিশুদের সময়মতো টিকা দেওয়া হয়েছে কি না, খোঁজ নেন।
কুয়াশা চাকমা বলেন, ‘এ সমিমিতে নারী-পুরুষ সবাই সমান। সবাই সমান পরিশ্রম করে। তবে সবাইকে কাজ ভাগ করে দেওয়া আছে। এটা শুধু একটা সমিতি নয়। আমাদের স্বপ্ন, সমিতির সব সদস্যকে একটি পরিবারে রূপান্তরিত করা। আমরা সবাই সবার সুখে সুখী, সবার দুঃখে দুঃখী।’ তিনি আরও জানান, পরিবারগুলোকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে কয়েকজন তরুণকে পল্লি চিকিৎসায় প্রশিক্ষণ নিতে পাঠানো হয়েছে। পুকুরে মাছের খাবার দেওয়ার জন্য রয়েছে একটি যুব কমিটি। এই কমিটির কাজ হচ্ছে শুধু মাছের খাদ্য দেওয়া এবং গ্রামের পরিবারগুলোর কাছ থেকে মাসে ১০০ টাকা হারে চাঁদা তুলে মাছের খাবার কিনে আনা।
রাহুল চাকমা বলেন, ‘আমাদের প্রধান লক্ষ্য, গ্রামের সব পরিবারকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা। গ্রামের প্রতিটি পরিবারের জন্য শিশুকে স্কুলে পাঠানো বাধ্যতামূলক। প্রতিদিন আমরা খোঁজ নিই, কোনো শিশু স্কুল কামাই করছে কি না। গ্রামবাসীকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন করতে ২০১১ সালে একটি ‘রাইস-ব্যাংক’ চালু করার ইচ্ছা পোষণ করেন রাহুল চাকমা। গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থীদের সমিতি থেকে উপবৃত্তি দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন তাঁরা। সমিতির মূলমন্ত্র হচ্ছে, মাসিক সভায় সব সদস্যের কথা বলার অধিকার ও তাঁদের পরামর্শ নেওয়া। তাঁদের সমিতিটি সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধনভুক্ত, জানালেন রাহুল চাকমা।
এমন একটি সমবায় সমিতির কথা শুনে ৩ অক্টোবর বৈদ্যপাড়া গিয়েছিলেন দীঘিনালার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান মিঞা। সঙ্গে ছিলেন উপজেলা পরিষদের নারী ভাইস চেয়ারম্যান শতরুপা চাকমা, মৎস্য কর্মকর্তা অবর্ণা চাকমা ও দীঘিনালা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান চন্দ্র রঞ্জন চাকমা। সমিতির কার্যক্রম দেখে ইউএনও বলেন, ‘একটি পশ্চাৎপদ গ্রামে এ ধরনের সমিতি সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমি নিজে ঘুরে না দেখলে গল্প বলে ভাবতাম। এখন দেখছি সত্যি এটি একটি সোনার গ্রাম।’
ইউপি চেয়ারম্যান চন্দ্র রঞ্জন চাকমা বলেন, ‘গ্রামে যত রাস্তা সবই গ্রামবাসীর করা। আমার ইউনিয়নের মধ্যে এ ধরনের একটি গ্রাম আছে, সেটাই আমার বড় অহংকার।’

No comments: