Tuesday, October 5, 2010

জ্ঞানমেলা থেকে জ্ঞানগ্রাম



নতুন আধুনিক প্রযুক্তির প্রতি শিশুদের ছিল ব্যাপক আগ্রহ নতুন আধুনিক প্রযুক্তির প্রতি শিশুদের ছিল ব্যাপক আগ্রহ

রুদ্রর গ্রাম মিঠাখালী। বাগেরহাটের মিঠাখালী গ্রামটিকে আমরা চিনি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্মস্থান হিসেবেই। সেই মিঠাখালীকেই এবার চেনা গেল অন্য মাত্রায়।
মিঠাখালী গ্রামের অনেক নারী নকশার কাজ করেন। শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, বিছানার চাদর নানা কাপড়ে ফুটে ওঠে তাঁদের হাতের কাজ—চমত্কার সব নকশা। আবার কেউ বা করেন বাঁশের কাজ, কেউ বা বোনেন মাদুর। এসবের ক্রেতা আছে বিশ্বজুড়ে। অবাক হলেন? ঘটনাটা অবাক হওয়ার মতোই। মিঠাখালীর এই নারীদের হাতের কাজ ইন্টারনেটে একটি ই-শপে রাখা হয়েছে—আমার দেশ ই-শপ। সাইটে ঢুকে মিঠাখালীর এসব কাজ দেখা যাবে, কেনাও যাবে। এখন দেশে বসেও কেনা যাবে, অনলাইনেই দাম মিটিয়ে দেওয়া যাবে। পরে পণ্য চলে যাবে ক্রেতার ঠিকানায়। অনলাইনে মিঠাখালীর পণ্য কীভাবে বিক্রি হচ্ছে, গ্রামের নারীদের হস্তশিল্প কীভাবে উঁকি দিচ্ছে আন্তর্জাতিক বাতায়নে, তা দেখা গেল জ্ঞানমেলায়।
জ্ঞানমেলা বলতেই শ্রীফলতলা নামটি এসে যায়। এটা একটি গ্রাম, বাগেরহাটের রামপাল থানায়। গত ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি শ্রীফলতলা পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে বসেছিল এবারের জ্ঞানমে
 
লা। সেখানে লোকজ মেলার পুরো চরিত্রের মধ্যে দেখা গেছে তথ্যপ্রযুক্তির নানামুখী ব্যবহার। আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প এই নিয়ে পাঁচবার আয়োজন করল জ্ঞানমেলার। প্রতিবারই দেখা গেছে এ মেলা শ্রীফলতলা তো বটেই আশপাশের গ্রামগুলোতেও নিয়ে আসে উত্সবের আমেজ। শুধু কী তাই? প্রতিবারই ঢাকা থেকে তথ্যপ্রযুক্তিসহ নানা ক্ষেত্রের বেশ কিছু মানুষ যান এই জ্ঞানমেলায়। অনেকে আবার এ আয়োজনের প্রতীক্ষায়ও থাকেন। যেমন ডিজিটাল নলেজ ফাউন্ডেশনের টি আই এম নূরুল কবির। বললেন, আমি শুধু একবার জ্ঞানমেলা মিস করেছি। বাকি চারবারই এসেছি মেলায়। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি মোস্তাফা জব্বারও জ্ঞানমেলার নিয়মিত অতিথি। এবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তো রীতিমতো দীর্ঘ এক মতবিনিময় সভা সঞ্চালনা করলেন। চিত্রশিল্পী মাহমুদুল হক তাঁর নিজের গ্রাম শ্রীফলতলায় অন্য সময় যান বা না যান, জ্ঞানমেলায় যাবেনই।
মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ততার কারণেই জ্ঞানমেলার এ আয়োজন দুই দিন ধরে জমজমাট থাকে। এবারের মেলায় নানা মাত্রায় স্থানীয় জ্ঞানের প্রকাশ দেখা গেছে। মাদুর তৈরি, মৃত্পাত্র তৈরি থেকে শুরু করে মেহগনি গাছের ছাল-বাকল, ফল থেকে নানা ভেষজ দ্রব্য তৈরির বিষয়গুলো হাতে-কলমে দেখতে পেয়েছেন দর্শকেরা। তথ্যপ্রযুক্তি গ্রামের মানুষের কী কাজে লাগে তা শ্রীফলতলায় সারা বছরই বুঝিয়ে দিচ্ছে আমাদের গ্রাম। শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা থেকে শুরু করে হিসাব-নিকাশ সবকিছুতে তথ্যপ্রযুক্তি কী কাজে লাগে তা তো জানাচ্ছেই প্রতিষ্ঠানটি, পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে স্তন ক্যানসার নিরীক্ষা ও চিকিত্সার কাজটিও করছে।
জ্ঞানমেলায় আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে, যেগুলো নানাভাবে তৃণমূলের মানুষদের কাছে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণকর নানা সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। বাংলাদেশ টেলিসেন্টার নেটওয়ার্ক (বিটিএন) দেখিয়েছে তথ্যসেবার নমুনা। জ্ঞানমেলায় বিটিএন ইন্টারনেটভিত্তিক তথ্যসেবার একটি ওয়েবসাইটেরও উদ্বোধন করেছে। সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষের কাছে কম্পিউটার কীভাবে যাচ্ছে তা দেখা গেল সুন্দরবন আইটি এক্সেস সেন্টারে। ই-কৃষক সেবার নমুনা দেখিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব আইসিটি ইন ডেভেলপমেন্ট।
এবারের জ্ঞানমেলায়ই নিজেদের একটি ওয়েবসাইট ইন্টারনেটে চালু করে পেড়িখালী পি ইউ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ঠিকানা www.pkss.org। সাইটটিতে আছে বিদ্যালয়ের সব তথ্য। বাংলা, ইংরেজি দুই ভাষাই ব্যবহার করা হয়েছে সাইটটিতে। বেশ কিছু স্কুলের অংশগ্রহণ ছিল মেলায়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দেখিয়েছেন কীভাবে নিজেদের কাজে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করেন।
শুধুই এসব প্রকল্পের প্রদর্শনী নয়, নাগরদোলা, বাঁশি, খেলনা, চটপটি-ফুচকা-হালিমের দোকান, লেস-ফিতা কী ছিল না মেলার মাঠে? কখনো আলোচনা, কখনো রূপান্তরের পটগান, জারিগান, পুঁথিপাঠ, স্থানীয় শিল্পীদের গানে মেলার মঞ্চটি মেতে ছিল দুই দিন ধরে। মেলার শুরুটাই তো হয়েছিল স্থানীয় ‘ঢালীখেলা (লাঠিখেলা)’ দিয়ে। আরেক দিকে শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল গণিত, কুইজ, ক্যারম, দাবা, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতাসহ নানা প্রতিযোগিতার আয়োজন। আবার আমাদের গ্রামের কার্যালয়ের জ্ঞানকেন্দ্রের খোলা উঠানো বসেছিল তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আড্ডা। মেলা শুরুর আগের দিন ২৬ জানুয়ারি জ্ঞানমেলার অংশ হিসেবে খুলনা শহরে অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণ অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে দীপক কামাল স্মারক বক্তৃতা।
মেলার মাঠে যে মঞ্চটি ছিল সেটার পটভূমিতে লেখা ছিল ‘শ্রীফলতলা জ্ঞানগ্রামে স্বাগতম’। এবার এই মেলার মাধ্যমেই জ্ঞানগ্রাম ধারণার যাত্রা শুরু। ব্যাপারটি খোলাসা করেন আমাদের গ্রামের পরিচালক রেজা সেলিম। বলেন, ‘জ্ঞানগ্রামে জ্ঞানের চর্চা হবে। নানা জনের মধ্যে নানা জ্ঞানের বিনিময় হবে। গ্রামের ঐতিহ্য, সংস্কৃতির যে বৈশিষ্ট্য তা যেন ঠিক থাকে। এখানে যেন প্রযুক্তি স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়। জ্ঞানগ্রামে থাকবে অনেকগুলো জ্ঞানকেন্দ্র।’ তিনি জানান, শ্রীফলতলায় ১৯ থেকে ২১ বছর বয়সীদের মধ্যে ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশই কম্পিউটার জানে।
কম বয়সীদের মধ্যে এই যে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে, তার কারণেই প্রতিবছর শ্রীফলতলায় অনুষ্ঠিত হয় জ্ঞানমেলা। আর জ্ঞানমেলা থেকেই শ্রীফলতলা পরিণত হয় জ্ঞানগ্রামে। 
 
সুত্র: প্রথম আলো। পল্লব মোহাইমেন, রামপাল  | তারিখ: ১২-০২-২০১০

No comments: