Wednesday, October 6, 2010

জগদ্দল এক উপহার স্টাচু অব লিবার্টি


জগদ্দল এক উপহার

১৮৮৬ সালের ২৮ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে তত্কালীন বেডলোস দ্বীপে স্থাপন করা হয়েছিল ফরাসি উপহার স্ট্যাচু অব লিবার্টি। কালক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠা এই বিশাল মূর্তি আজও দুনিয়ার এক বিস্ময়কর দ্রষ্টব্য। শতবর্ষেরও বেশি বয়স হয়ে যাওয়া এই মূর্তির গল্প শুনিয়েছেন শামীম আমিনুর রহমান

মানুষ মানুষকে উপহার দেয়। এক পরিবার আরেক পরিবারকে উপহার দেয়, এমনকি এক দেশও আরেক দেশকে উপহার দেয়। কিন্তু সে উপহারটা আকারে কত বড় হতে পারে?
একটা টেলিভিশন, ফ্রিজ থেকে শুরু করে আস্ত বাড়ি উপহারের কথা চিন্তা করা যায়। কিন্তু উপহারের ওজন যদি হয় ২০৪.১ মেট্রিক টন? উপহারটির উচ্চতা যদি হয় ৩০৫ ফুট ৬ ইঞ্চি! ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে এমনই ‘বিকটাকার’ একটি উপহার দেওয়া হয়েছিল ফ্রান্সের তরফ থেকে। সেই উপহারটিই স্ট্যাচু অব লিবার্টি—দ্য লেডি!
এই যুগান্তকারী উপহারের পরিকল্পনার শুরু একটা নৈশভোজের টেবিলে। ১৮৬৫ সালের এক রাতের কথা। ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি ও তাঁর বন্ধু এডওয়ার্ড ডি ল্যাবোলেঁ সেদিন ল্যাবোলেঁর বাড়িতে বসে নৈশভোজ-পরবর্তী আড্ডা দিচ্ছিলেন। ওই আড্ডাতেই কথায় কথায় ল্যাবোলেঁ তাঁর একটা গোপন স্বপ্নের কথা বলে ফেললেন বার্থোল্ডিকে।
ব্যক্তিগত জীবনে ল্যাবোলেঁ ছিলেন শিক্ষক ও রাজনীতিবিদ, সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রপ্রেমিক। ল্যাবোলেঁর স্বপ্ন, ফরাসি-মার্কিন বন্ধুত্বের চিহ্ন হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে বড়সড় একটা উপহার দেওয়া; মার্কিনিদের স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে ফরাসিদের যে বিপুল অবদান, সেটাকে কোনোভাবে স্মরণীয় করে রাখা।
পরিকল্পনাটা শুনে বার্থোল্ডি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। তিনিও তো এমন একটা সুযোগ খুঁজছিলেন! বার্থোল্ডির স্বপ্ন অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক ছিল না। তিনি বিরাটাকার কোনো একটা স্থাপনা তৈরির সুযোগ খুঁজছিলেন। সম্ভব হলে সেটা কোনো সমুদ্র-উপকূলে স্থাপন করারও স্বপ্ন দেখতেন তিনি।
১৮৩৪ সালের ২ আগস্ট ফ্রান্সের কোলমার শহরে জন্মগ্রহণ করা বার্থোল্ডি চিরটা কালই বড় স্থাপনার নেশায় কাটিয়েছেন। বয়স বিশ পার হতে না হতেই বিরাট আকারের ভাস্কর্য ও স্থাপনা নির্মাণের স্বপ্ন বার্থোল্ডির পাগলামিতে পরিণত হয়।
এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপযুক্ত স্থান ও পৃষ্ঠপোষক খুঁজতে দুনিয়া চষে বেড়িয়েছেন তিনি। ১৮৫৬ সালে মিসরে গিয়েছিলেন প্রাচীন স্থাপত্য ও ভাস্কর্য দেখার জন্য। ওই যাত্রাপথে সুয়েজ খাল মনে ধরে গেল তাঁর। পরে মিসর সরকারকে অনুরোধ করেছিলেন সুয়েজের মুখে একটা বিরাট নারীমূর্তি স্থাপনের অনুমতি দিতে। কিন্তু সে প্রস্তাব গৃহীত হয়নি।
বার্থোল্ডির মনে এরপর দাগ কাটে নিউইয়র্ক শহরের পোতাশ্রয়। ১৮৭১ সালে প্রথম আমেরিকা সফরের সময় শহরটিতে ঢুকতে গিয়েই তাঁর মনে হয়েছিল, এখানে হতে পারে স্বপ্নের সেই স্থাপনা। স্থাপনাটি মশাল হাতে একটি নারীমূর্তি হবে, এমন কল্পনাও করেছিলেন তিনি।
কল্পনাটা কল্পনাই থেকে যেত। কিন্তু ল্যাবোলেঁর প্রস্তাব শুনে নড়েচড়ে বসলেন বার্থোল্ডি—এবার স্বপ্ন সত্যি হবে। স্বপ্ন অবশ্য এত সহজে সত্যি হলো না। এই পরিকল্পনার প্রায় ১০ বছর পর ফ্রান্সের সরকার পরিবর্তনের পরই তা
সম্ভব হয়েছিল।
পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে ল্যাবোলেঁ ও তাঁর বন্ধুরা মিলে গঠন করলেন ফ্রেঞ্চ-আমেরিকান ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নই সম্ভাব্য মূর্তিটির জন্য চাঁদা তুলতে শুরু করল।
চাঁদার টাকায়ই প্যারিসে শুরু হলো পরবর্তীকালের সবচেয়ে উঁচু ও বিখ্যাত ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজ। প্রথমে তার নাম দেওয়া হলো ‘লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়ার্ল্ড’, যা পরে ‘দ্য স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
প্রথমেই এল ভাস্কর্যের মুখের জন্য মডেল নির্বাচনের পালা। এই কাজটি নিয়ে অনেক গল্পে আছে। বার্থোল্ডি আসলে ঠিক কার মুখ অনুসরণ করে ‘দ্য লেডি’র মুখটা তৈরি করেছিলেন, তা কখনো বলেননি। তবে অনেকে অনুমান করেন, বার্থোল্ডির বন্ধু এক সমকালীন ব্যবসায়ীর বিধবা স্ত্রীর মুখ ব্যবহূত হয়েছে মডেল হিসেবে। আবার কারও অনুমান, এটি আসলেবার্থোল্ডির মায়ের মুখ।
সে যা-ই হোক, এরপর বার্থোল্ডি কাঠামোর নকশা করার জন্য অনুরোধ করলেন সে সময়ের বিখ্যাত স্থপতি ভাইয়োলে-লি-ডাককে। ডাক হয়তো কাজটা করতেনও, কিন্তু কাঠামোর নকশা শেষ করার আগেই তিনি মারা যান করেন। এবার ডাক পড়ে আরেক কিংবদন্তি আলেকজান্ডার গুস্তাভ আইফেলের। সে সময়ে আয়রন ব্রিজের নকশা করে আইফেল বেশ বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন। পরে তো প্যারিসে নিজের নামে এক টাওয়ারের নকশা করে অমর হয়ে গেছেন।
এবার প্যারিসে শুরু হলো টুকরো টুকরো অংশের কাজ। সবার আগে শেষ করা হলো মশাল ধরা ডান হাতটি। এবার সেটি পাঠিয়ে দেওয়া হলো আমেরিকায়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রেও তখন তহবিল সংগ্রহ শুরু হয়েছে। ১৮৭৬ সালে ফিলাডেলফিয়ায় পাঠানো এই ডান হাত আবার ফেরতও পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ওদিকে ১৮৮২ সালে মূর্তিটির পাদমূল তৈরির জন্য দায়িত্ব পান মার্কিন স্থপতি রিচার্ড মরিস হান্ট। তিনি কাজ শুরু দেন।
বিশাল এই মহাযজ্ঞ অবশেষে ১৮৮৪ শেষ হয়। প্যারিসে পরীক্ষামূলকভাবে মূর্তির সব অংশ জুড়ে দাঁড় করিয়েও ফেলা হয়। এবার উপহার দেওয়ার পালা।
দুই সরকার এবার এগিয়ে এল এই কর্মকাণ্ডে। ফ্রান্সে আমেরিকার প্রতিনিধি লেভি পি মরটুন ১৮৮৪ সালেই আনুষ্ঠানিকভাবে ইউনিয়নের কাছ থেকে গ্রহণ করলেন ভুবন নাড়ানো এ উপহার। পরের বছর জাহাজে টুকরো টুকরো অবস্থায় ফ্রান্স থেকে নিউইয়র্ক যাত্রা করল ‘দ্য লেডি’।
শুরু হলো সংযোজনপর্ব। নিউইয়র্ক পোতাশ্রয়ের কাছে নির্ধারিত দ্বীপে এরই মধ্যে তৈরি করে ফেলা পাদমূলের ওপর ধীরে ধীরে জোড়া দিয়ে দাঁড় করিয়ে ফেলা হলো স্ট্যাচু অব লিবার্টি। অবশেষে এল ১৮৮৬ সালের ২৮ অক্টোবর।
অভূতপূর্ব এক লোকসমাগম হলো। ধারণা করা হয়, সব মিলে প্রায় ১০ লাখ লোকের সমাবেশ হয়েছিল সেদিন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের যেসব ধনী ব্যক্তি এই ‘পাগলামি’তে একটি পয়সাও দেননি, তাঁরাও এলেন উত্সব দেখতে।
এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড উন্মোচন করলেন দ্য লেডির মুখ!
কিন্তু হায়! এমন দিন আর দেখে যেতে পারলেন না সেই ল্যাবোলেঁ। স্ট্যাচু অব লিবার্টির উদ্বোধনের তিন বছর আগে ১৮৮৩ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মারা যাওয়ার বেশ কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, ‘এক শ বছর পর আমরা বিস্মৃত ধূলিকণা হয়ে যাব। কিন্তু ভাস্কর্যটি টিকে থাকবে।’
না, ল্যাবোলেঁ ধূলিকণা হননি। নিজের স্বপ্নের ভেতর দিয়েই টিকে আছেন এই স্বপ্নদ্রষ্টা। 
 সুত্র : প্রথম আলো।  তারিখ: ৩০-১০-২০০৯
 

No comments: